বিতর্কে ঠাসা বিশ্বকাপে জিতল আর্জেন্টিনা

· Prothom Alo

প্রচলিত আছে, খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না। কিন্তু খেলা এমন এক মাধ্যম, যা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে বারবার। রাজনীতির মঞ্চে বড় হতে চাইলে খেলার মতো উপকারী গল্প আর কিছুর নেই। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছিল ১৯৭৮ বিশ্বকাপ।

সবচেয়ে পক্ষপাতদুষ্ট বিশ্বকাপের কথা উঠলে সবার আগে নাম আসবে ১৯৩৪ ইতালি বিশ্বকাপের। ফ্যাসিজমের কর্ণধার বেনিতো মুসোলিনি রেফারিদের সঙ্গে বসে ঠিক করতেন ম্যাচের ফলাফল। এর পর থেকেই ফিফা সিদ্ধান্ত নেয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে—এমন কোনো দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের আগে দুবার ভাববে তারা।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

১৯৭৮ বিশ্বকাপের পোস্টার

যে কারণে বহু জোরাজুরির পরও কিছুতেই জার্মানি আর আর্জেন্টিনা নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে সক্ষম হচ্ছিল না। কিন্তু অবশেষে ফিফা মুখ তুলে তাকায় ১৯৭৮ সালে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু ফেরাটা ঠিক সুখকর ছিল না আর্জেন্টিনার জন্য।

খলনায়ক থেকে যেভাবে নায়ক হয়ে উঠলেন রসি

বিশ্বকাপে শুরুর বছর দুই আগে আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট ইসাবেল মার্টিনেজ পেরনকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক সরকার গঠন করেন জেনারেল জর্জ রাফায়েল ভিদেলা। ক্ষমতা পাওয়ামাত্র শুরু হয় অসহনীয় অত্যাচার। এক এক করে গুম হতে শুরু করেন ভিন্ন মতাদর্শী লোকজন। এমনও শোনা যায়, সরকার গঠনের তিন মাসের মাথায় নিখোঁজ হন সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ।

আর্জেন্টিনা সরকারের এমন স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রতি প্রথম আঙুল তোলেন তৎকালীন ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা নেদারল্যান্ডসের ইয়োহান ক্রুইফ ও জার্মানির পল ব্রেটনার। আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলে সেখান থেকে নাম সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেন তাঁরা। আর্জেন্টিনার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে পৃথিবীর অনেক দেশই সেবার বিশ্বকাপ বয়কটের চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল। এমন হুমকিতে নড়েচড়ে বসে ফিফা। কিন্তু এক বছরের মধ্যে বিশ্বকাপ অন্য কোথায় সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব ব্যাপার ছিল তাদের জন্য। বিশেষ বিবেচনা ও নিয়ম-নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল মেনে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ আয়োজনের অনুমতি দেয় ফিফা। কিন্তু নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন ক্রুইফ ও ব্রিটনার। বিশ্বকাপ বয়কট করেন তাঁরা দুজনে।

বিশ্বকাপ বয়কট করেন নেদারল্যান্ডসের ক্রুইফ (বার্সার জার্সি) ও পল ব্রিটনার (রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি)।

কিন্তু বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতেই শুরু হয় স্বৈরাচারী সরকারের প্রভাব। বিশ্বকাপের মাত্র কয়েক মাস আগেই গুম করে ফেলা হয় বিশ্বকাপ আয়োজক কমিটির প্রধানকে। বিশ্বকাপের শিডিউলেও আনা হয় ব্যাপক পরিবর্তন। আর্জেন্টিনার গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচের সময় নিয়ে যাওয়া হয় রাতে। যাতে গ্রুপের বাকি ম্যাচগুলোর ফলাফল জেনেই মাঠে নামার সুযোগ ছিল তাদের হাতে। আর তার পূর্ণ সুযোগ নেয় আলবেসিয়েস্তারা।

ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গ্রুপ পর্ব পার করে আর্জেন্টিনা। কিন্তু তাদের মূল খেলা শুরু হয় ব্রাজিল, পেরু ও পোল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডে। নিজেদের প্রথম ম্যাচ জিতে নেয় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দুই দল। এরপর ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ড্র হয়। শেষ ম্যাচে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল ৩-১ গোলে জিতলে আর্জেন্টিনার জন্য সমীকরণ দাঁড়ায় শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে অন্তত ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হবে তাদের।

পেরুর বিপক্ষে ৬-০ গোলে জয়ের পর আর্জেন্টিনা।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে সে ম্যাচ আর্জেন্টিনা জিতে নেয় ৬-০ গোলে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে যায় পেরু-আর্জেন্টিনা ম্যাচ। অভিযোগ ওঠে পাতানো ম্যাচের—ব্রাজিলের সাংবাদিকেরা নজর রাখতে শুরু করেন পেরুর খেলোয়াড়দের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। এমনকি পেরুর বামপন্থী নেতারা দাবি করেন, এই ম্যাচের পরই আর্জেন্টিনায় বন্দী থাকা পেরুর ১৩ বিদ্রোহীকে পেরুর হাতে তুলে দিয়েছিল আর্জেন্টাইন সরকার।

হিগুয়েতার ভুল

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল পুরো টুর্নামেন্টে বাজে রেফারিং, মিডিয়ার চাপ, সামরিক লোকজনের মাঠে অবাধে আসা-যাওয়া করার অনুমতি। সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল পুরো বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ ফাইনালে আরও প্রকট হয়ে ওঠে সে সমস্যা। একই হোটেল থেকে আর্জেন্টিনা দল যেখানে মাঠে পৌঁছে যায় সহজেই, নেদারল্যান্ডস দলকে সেখানে ঘুরিয়ে আনা হয় বহুদূর। এমনকি নেদারল্যান্ডস দাবি করে, ম্যাচের আগে তাদের ট্যাক্টিস চুরি করেছিল আর্জেন্টিনা। যদিও ম্যাচে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছিল নেদারল্যান্ডস। প্রথম ৯০ মিনিট শেষ হয়েছিল ১-১ গোলে। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মারিও কেম্পেস ও রিকার্ডো বের্তোনির গোলে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের করে নেয় আর্জেন্টিনা।

১৯৭৮ বিশ্বকাপ ফাইনাল।

পর্দার পেছনে সামরিক জান্তা সরকারের প্রভাব যতই থাকুক না কেন, ৭৮ বিশ্বকাপ জয় সুগম করেছিল আর্জেন্টিনার বিশ্বযাত্রা। যার পথ ধরেই আর্জেন্টাইন ফুটবল রাঙিয়েছেন ম্যারাডোনা, বাতিস্তুতা, রিকুয়েলমে, তেভেজ, মেসিরা।

‘বাজ্জো মারা গিয়েছিলেন দাঁড়িয়ে’

Read full story at source