এবারের বাজেট যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়
· Prothom Alo

এবারের বাজেট কোনোভাবেই যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়, বাজেট যেন সাধারণ জনগণের হয়, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও রংপুর–৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
Visit betsport.cv for more information.
এই নেতা বলেন, প্রতিবছর বাজেটের সময় শোনা যায়, শিক্ষা-স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হবে, প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের কথা চিন্তা করে বাজেট প্রণয়ন করা হবে। কিন্তু বাজেট পাস হওয়ার পর দেখা যায়, আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতাপূর্ণ গতানুগতিক বাজেট উপহার দেওয়া হয়।
আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এক আলোচনা অনুষ্ঠানে আখতার হোসেন এ কথা বলেন। ‘বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ আলোচনার আয়োজন করে এনসিপির ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটি।
বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে এনসিপির এ আয়োজন শুরু হয়। এরপর জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এরপরই উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি জানান, এনসিপির পক্ষ থেকে সরকারকে বাজেটের একটি রোডম্যাপ (পথনকশা) দিতে দলীয়ভাবে ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটি করা হয়েছে। সেই কমিটির উদ্যোগে বাজেট ও অর্থনীতির বিষয়ে বোঝাপড়া আছে, এমন বিদগ্ধ পণ্ডিত মানুষদের নিয়ে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।
‘আওয়ামী লীগের সময় বাজেট মুখ্য বিষয় ছিল না, এটা ছিল কাগুজে দলিল’ বলে মন্তব্য করেন আখতার হোসেন। তিনি বলেন, তখন দেশ পরিচালনা করত কয়েকটি করপোরেট গোষ্ঠী। তারাই দেশের পয়সাগুলোর মালিক ছিল, তাদের হাত ধরে দেশের অর্থ বিদেশে পাচারও হলো। তার খেসারত দেশের মানুষকে এখনো দিতে হচ্ছে।
এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমকে ইঙ্গিত করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘তারা যে বাংলাদেশের নাগরিক, সেটাও এখন স্বীকার করতে চায় না। তারা বিদেশে চলে গেছে। যখন জবাবদিহির সময় এসেছে, তখন দেশের নাগরিকত্বই ছেড়ে দিতে চায়। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, সামনের দিনের বাজেট কোনোভাবেই যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়, বাজেট যেন সাধারণ জনগণের হয়।’
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনসিপির আরেক সংসদ সদস্য ও দলের ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান আতিক মুজাহিদ। তিনি বলেন, তাঁদের কমিটি নিম্ন আয়ের মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। দেশের মানুষের চাহিদা কী, সাধারণ মানুষের জন্য কেমন বাজেট হওয়া উচিত—এনসিপির পক্ষ থেকে সে প্রস্তাব দেওয়া হবে। আসলে বাংলাদেশের মানুষ সরকারের কাছে কোনো দয়া চায় না, তারা চায় তিনটা জিনিস—ন্যায্যতা, নিশ্চয়তা এবং অনিয়ম-হয়রানির অবসান।
বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে
বক্তব্য দেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। ২১ মেউদ্বোধনী পর্বের পরপরই আলোচনার প্রথম পর্ব শুরু হয়। আলোচনার বিষয় ছিল ‘অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর’। এতে অংশ নিয়ে সাবেক অর্থসচিব এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। সরকার যদি অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো খুব কঠিন হবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে না। যদি সরকার বেসরকারি খাতের জন্য টাকা রাখতে চায়, তাহলে বাজারে টাকা ছাপিয়ে ছাড়তে হবে। কম মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এটা করা যেত। কিন্তু অনেক দিন ধরে আমাদের মুদ্রাস্ফীতি খুব বেশি। ফলে এটা অর্থনীতিতে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।’
সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্পর্কে মুসলিম চৌধুরী বলেন, ২০টি মন্ত্রণালয়ে এমন শতাধিক কর্মসূচি আছে। এসব কর্মসূচিকে যদি একটি ছাতার নিচে এনে ডিজিটালাইজ করা হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং উপকারভোগী বাড়ানো যাবে। এ ছাড়া দেশের দেউলিয়া ব্যাংকগুলো বন্ধ বা অবসায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং কর আদায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন তিনি।
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান। ২১ মেসিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯ অনুযায়ী বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি উপস্থাপন করে। এ আইনের অধীনে অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিন মাস পর বাজেটের অগ্রগতি কী হচ্ছে, তা পেশ করার কথা। কিন্তু এটা করা হয় না, যা একটি বড় আইনি ব্যত্যয়। এ ছাড়া ত্রৈমাসিক বাজেট অগ্রগতির প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে দেওয়া বন্ধ রয়েছে। এটি স্বচ্ছতার ঘাটতি।
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের ব্যয় ছিল তখনকার মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন ব্যয় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে হয়েছিল। তা ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। কর ফাঁকি রোধে তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভূমি ও গাড়ি নিবন্ধন যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল করব্যবস্থার প্রস্তাব তুলে ধরেন। তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুই দশক ধরে এনবিআরের সংস্কারের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
অর্থনীতির শিক্ষক খান জহিরুল ইসলাম। ২১ মেআলোচনায় অংশ নিয়ে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতির শিক্ষক খান জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত। আসন্ন অর্থবছরের সম্ভাব্য প্রস্তাবিত বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশে কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণই ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ না থাকলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়নকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত, ভাবুন।’ এই শিক্ষক বলেন, কেবল এস আলম গ্রুপ দেশ থেকে মোট ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি থাকা পাচার করেছে। এটা আগামী বাজেটে সরকার এডিপিতে (বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা) যে বাজেট রেখেছে, তার সমান। বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন সংশোধন করে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফেরত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। অর্থাৎ সরকার আবার লুটেরাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একজন অ্যাকাউন্ট্যান্টকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদে বসিয়েছেন। পৃথিবীর কোথাও এ রকমটা হয় না।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রথম পর্বের আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সাদিয়া ফারজানা। আলোচনা অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ‘শিক্ষা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কর্মসংস্থান’, তৃতীয় পর্বে ‘স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা’, চতুর্থ পর্বে ‘কৃষি, শিল্প বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি উন্নয়ন’ এবং পঞ্চম পর্বে ‘টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। রাতে সমাপনী বক্তব্য দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।