শীর্ষ উপদেষ্টারা ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা তৈরি করছেন, এখন ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
· Prothom Alo

শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে পড়ায় আগামী সপ্তাহেই ইরানের ওপর নতুন নামে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
Visit chickenroadslot.lat for more information.
চীন সফর থেকে ফেরার পথে ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং চুক্তি না হলে ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
হামলার পাশাপাশি পারমাণবিক কেন্দ্রে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা, এ জন্য মার্কিন বিশেষ বাহিনীকে সরাসরি নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইরানও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র আবার সচল করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর শেষে গতকাল শুক্রবার দেশে ফিরেছেন। এখন তিনি ইরান নিয়ে বড় ধরনের কিছু সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ট্রাম্প আরও বেশি বোমা মেরে এই অচলাবস্থা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, এমনটা মাথায় রেখে আবার অভিযান শুরু করতে ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছেন তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা।
উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে স্বার্থসংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। তাঁরা ইরানকে বুঝিয়ে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এটা হলে ট্রাম্প নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে পারবেন। তিনি সন্দিহান মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে পারবেন, ইরানে এই ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী সামরিক অভিযান সফল ছিল।
কিন্তু বেইজিং ছাড়ার পরপরই শুক্রবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের কাছে ট্রাম্প আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ইরানের সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য ছিল না।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি দেখেছি। আর প্রথম বাক্যটিই যদি আমার পছন্দ না হয়, তবে আমি তা সরাসরি ফেলে দিই।’
ট্রাম্প বলেন, তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ইরানের বিষয়ে আলোচনা করেছেন। চীন হচ্ছে তেহরানের কৌশলগত অংশীদার, যারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
ট্রাম্প বলেন, তিনি সি চিন পিংকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বলেননি। তাঁদের আলোচনার পূর্ণ বিবরণ এখনো সামনে আসেনি।
অভিযান শুরুর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন
এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে দ্বিমুখী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যদিও এটি তাঁর জন্য রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁকে বিষয়টি পার করে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্গ্রীব বলে মনে হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট এখনো সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি। তিনি প্রায়ই যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে বলেছিলেন, ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আগামী দিনগুলোতে আবার শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। গত মাসে প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর সাময়িকভাবে এ অভিযান স্থগিত করা হয়েছিল। তবে এবার এটি নতুন কোনো নামেও শুরু হতে পারে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এ সপ্তাহে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আইনপ্রণেতাদের বলেন, ‘প্রয়োজন হলে যুদ্ধ আরও তীব্র করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে।’
হেগসেথ আরও বলেন, সবকিছু গুটিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। যদি তা–ই হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে মোতায়েন অতিরিক্ত ৫০ হাজারের বেশি সেনাকে আবার স্বাভাবিক দায়িত্বে ফিরিয়ে আনা হবে।
অভিযান–সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলা আবার শুরুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এটাকে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে।
চীন সফরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে গত মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘তারা হয় একটি চুক্তিতে আসবে, না হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেভাবেই হোক, জয় আমাদেরই হবে।’
আরও জোরালো হামলা
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ট্রাম্প আবার সামরিক হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত নিলে ইরানের সামরিক ও অবকাঠামোগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আরও জোরালো বোমা হামলা চালানো হবে।
কর্মকর্তারা বলেন, অন্য একটি বিকল্প হতে পারে, মাটির গভীরে লুকিয়ে রাখা পারমাণবিক উপাদানগুলো ধ্বংস করতে স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সক (বিশেষ অভিযান চালাতে দক্ষ বাহিনী) মাটিতে নামানো। কর্মকর্তারা বলেন, ট্রাম্পকে এই বিকল্প দেওয়ার উদ্দেশ্যেই গত মার্চে বিশেষ অভিযানে দক্ষ বাহিনীর কয়েক শ সদস্য মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ (মাঝে) ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ২৫ জুন ২০২৫, দ্য হেডবিশেষায়িত পদাতিক সেনা হিসেবে ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে লক্ষ্য করে চালানো অভিযানে তাঁদের ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযানের জন্য হাজার হাজার সহায়ক সেনার প্রয়োজন হবে, যারা সম্ভবত একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করবে এবং ইরানি সেনাদের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এই বিকল্পে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানির বড় ঝুঁকি রয়েছে।
ইরানের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই বলেছেন, তারাও যুদ্ধাবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্ট লিখেছেন, ‘যেকোনো আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দিতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। ভুল কৌশল ও ভুল সিদ্ধান্ত সব সময় ভুল ফলাফল বয়ে আনে। পুরো বিশ্ব ইতিমধ্যেই তা বুঝতে পেরেছে। আমরা সব ধরনের বিকল্পের জন্য প্রস্তুত; তারা বিস্মিত হবে।’
ইরানের ওপর নতুন করে যেকোনো হামলা সম্ভবত ঠিক সেখান থেকেই শুরু হবে, যেখানে গত ৭ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শেষ মুহূর্তের যুদ্ধবিরতির আগে লড়াই থেমেছিল। সেই চুক্তির আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচল করতে না দিলে তিনি ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ নিশ্চিহ্ন করে দেবেন।
ইরান সরকার তেল ট্যাংকারের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে দেশটির প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র সুশৃঙ্খলভাবে ধ্বংস করতে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক দিন ধরে নির্দেশ দেওয়ার হুমকি দিচ্ছিলেন। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, যেসব নিশানা ঠিক করা হয়েছিল, সেগুলোর সঙ্গে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অভিযানের সরাসরি সম্পর্ক ছিল।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ২০ বছর স্থগিত থাকলেই যথেষ্ট: ট্রাম্পতবে যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারকে বাধ্য করার উপায় হিসেবে বেসামরিক অবকাঠামো ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা বেআইনি।
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতির সময়ে এ অঞ্চলে তাদের যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলোকে আবার অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করার কাজ করেছে।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এই সপ্তাহে সিনেটের প্রতিরক্ষা উপকমিটিকে বলেছেন, ‘সামরিক কর্মকর্তারা আমাদের বেসামরিক নেতাদের জন্য বেশ কিছু বিকল্প প্রস্তুত করে রেখেছেন।’
তবে ট্রাম্প কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন, তা প্রকাশ করতে ড্যান কেইন অস্বীকৃতি জানান।
৫ মে পেন্টাগনের এক ব্রিফিংয়ে জেনারেল কেইন বলেন, ‘নির্দেশ পাওয়ামাত্রই ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করতে ৫০ হাজারের বেশি সেনা, ২টি বিমানবাহী রণতরি, নৌবাহিনীর এক ডজনের বেশি ডেস্ট্রয়ার ও বহু যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রয়েছে। কোনো শত্রুরই আমাদের বর্তমান সংযমকে দুর্বলতা ভাবা ঠিক হবে না।’
ইরান যুদ্ধ নিয়ে হেগসেথকে কেন সন্দেহ করছেন ভ্যান্স, তিনি কি আসলেই ট্রাম্পকে বিভ্রান্ত করছেনইরানে জয় সহজ হবে না
তবে সামরিক কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ বেশ কঠিন হতে পারে। তাঁরা বলছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র, আইআরজিসির গোলাবারুদ ডিপো, অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোসহ নির্ধারিত অন্যান্য নিশানায় সফলভাবে আঘাত হানতে পেরেছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ইরান তাদের বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র, উৎক্ষেপণ যন্ত্র ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে আবার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এই সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালি বরাবর তাদের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিরই কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, যা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেল ট্যাংকার চলাচলের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রায় ৫ হাজার মেরিন সেনা ও সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ২ হাজার প্যারাট্রুপার (ছত্রীসেনা) নির্দেশনার অপেক্ষায় এই অঞ্চলে রয়েছেন।
সেনা কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযান অনুমোদন পেলে ইস্পাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ইরানের পারমাণবিক উপাদানের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টায় এবং সেখানে নিয়োজিত বিশেষ বাহিনীর সুরক্ষায় একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করতে এই সেনাদের ব্যবহার করা যেতে পারে।
কর্মকর্তারা আরও বলেন, ইরানি তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখলের চেষ্টায়ও এই সেনাদের ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভূমিতে আরও বেশি সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হবে।
ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতা নিয়ে কংগ্রেসের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবে কী বললেন হেগসেথ