বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য বনাম শৃঙ্খলার অভাব
· Prothom Alo
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আজ আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং এটি একটি রূঢ় বাস্তবতা। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন এ দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, এর পেছনে ছিল এক গভীর সংকট নিরসনের স্বপ্ন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তীব্র আসনসংকট, সেশনজট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের যে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পেতেই বিকল্প এই ধারার উদ্ভব।
Visit afrikasportnews.co.za for more information.
কিন্তু আজ তিন দশক পর এসে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে একদিকে রয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য, অন্যদিকে ভেতরকার অব্যবস্থাপনার এক বিশাল জঞ্জাল।
বলা চলে, দেশের উচ্চশিক্ষার মূল ভার এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁধে। অথচ অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে পর্যাপ্ত জায়গার অভাব এক বড় প্রতিবন্ধকতা। ট্রাস্টের যে নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হওয়ার কথা, অনেক ক্ষেত্রেই সেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।
সবচেয়ে দুঃখজনক চিত্রটি ফুটে ওঠে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জীবনযাপনের দিকে তাকালে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাণ হলো শিক্ষক। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের জন্য নেই কোনো নির্দিষ্ট ও যুগোপযোগী বেতন স্কেল। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য কোনো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা উচ্চশিক্ষার জন্য যেমন সবৈব সুবিধা ও ছুটি পান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে তা আকাশকুসুম কল্পনা। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মনে করে, শিক্ষকেরা স্রেফ তাদের প্রতিষ্ঠানের ‘কর্মচারী’, যাঁদের কাজ কেবল সকাল-সন্ধ্যা ক্লাস নেওয়া। কিন্তু গবেষণার পরিবেশ তৈরি না করে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ না দিয়ে এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের গ্যারান্টি না দিয়ে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে বিশ্বমানের মেধা কীভাবে আশা করা সম্ভব?
এমনকি কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত বেতন-ভাতা না পাওয়ার অভিযোগও শোনা যায়, যা একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী বা নীতিনির্ধারকের জন্য লজ্জার। যখন একজন শিক্ষক তাঁর সংসার চালাতে হিমশিম খান, তখন তাঁর পক্ষে গবেষণায় মনোনিবেশ করা বা শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পাঠদান নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি প্রকারান্তরে জাতির মেধাশক্তির ওপর একধরনের নীরব আঘাত।
বর্তমানে আমাদের দেশে ‘আউটকাম বেজড এডুকেশন’ (OBE) এবং বাংলাদেশ অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিলের অনুমোদন পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একধরনের হুড়োহুড়ি বা প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জনের এই আকাঙ্ক্ষা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হতো, যদি তার ভিত্তি হতো শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় এই স্বীকৃতির জন্য উঠেপড়ে লেগেছে, তাদের অধিকাংশেরই নিজস্ব কোনো স্থায়ী বেতন-ভাতার কাঠামো বা সুনির্দিষ্ট পলিসি নেই।
শিক্ষক ও ক্লাসের লোড নির্ধারণের ক্ষেত্রেও কোনো সুষম বণ্টন দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ওপর অমানবিক ক্লাস লোড চাপিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে তাঁরা ক্লান্তিকর যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। যখন একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কাঠামো এত নড়বড়ে থাকে, তখন কেবল বাহ্যিক সার্টিফিকেটের তোড়জোড় করা একপ্রকার আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অভ্যুত্থানের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন ব্রাত্যসম্প্রতি বর্তমান সরকারের শিক্ষামন্ত্রীও একটি সাক্ষাৎকারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গতিপ্রকৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে কোন দিকে যাচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এই সংশয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধকারের দিকটিই উন্মোচিত করে। প্রশ্ন জাগে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কি তবে কেবল ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে থাকবে?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এই বিশাল সেক্টরটিকে তদারকির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু ইউজিসির কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে। তারা কেবল নিয়মমাফিক পরিদর্শক হিসেবে কাজ করবে নাকি শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর কোনো অভিভাবক হবে?
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ইউজিসি অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম জারি করেই তার দায়িত্ব শেষ করছে, কিন্তু সেই নিয়মগুলো তৃণমূল পর্যায়ে মানা হচ্ছে কি না, তা দেখার মতো প্রয়োজনীয় জনবল বা সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যথেচ্ছভাবে ডিগ্রি বিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই ডিগ্রির মান বৈশ্বিক শ্রমবাজারের জন্য কতটুকু উপযোগী, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরির যথাযথ সুবিধা নেই, পর্যাপ্ত স্থায়ী শিক্ষক নেই, অথচ তারা বড় বড় সেমিনারে বিশ্বমানের শিক্ষার কথা বলছে। এটি একধরনের কাঠামোগত প্রতারণা। এই প্রতারণা বন্ধ করতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষার প্রতি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও তৈরি করতে হবে।
উচ্চশিক্ষা কেবল কিছু নথিপত্র এবং সনদ প্রদান নয়, এটি একটি জাতিকে মেধাসম্পন্ন ও দক্ষ করে তোলার প্রক্রিয়া। যদি শিক্ষকদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তবে সেই প্রক্রিয়ায় মেধার সংযোগ ঘটা অসম্ভব। আমরা দেখছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকেরা যে ধরনের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, একই যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা সেখানে বৈষম্যের শিকার। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থা উচ্চশিক্ষা খাতের সামগ্রিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখন কোনো নিয়মরক্ষা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থে এটি একটি অপরিহার্য কাজ। শিক্ষা খাতে এই নৈরাজ্য চলতে থাকলে আমরা কেবল সার্টিফিকেটধারী একদল অদক্ষ জনবল তৈরি করব, যারা দেশের বোঝায় পরিণত হবে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই হলো রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতার মূলে রয়েছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক তদারকির অভাব।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি কেবল ‘সার্টিফিকেট কারখানা’ হিসেবে কাজ করে, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরি বা ল্যাবরেটরির যথাযথ সুবিধা নেই, পর্যাপ্ত স্থায়ী শিক্ষক নেই, অথচ তারা বড় বড় সেমিনারে বিশ্বমানের শিক্ষার কথা বলছে। এটি একধরনের কাঠামোগত প্রতারণা। এই প্রতারণা বন্ধ করতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষার প্রতি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতাও তৈরি করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বুঝতে হবে যে তারা কোনো পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং তারা মানুষ গড়ার কারিগর। আর এই কারিগরদের যদি ন্যূনতম সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়া না হয়, তবে তারা কক্ষচ্যুত হতে বাধ্য। শিক্ষকেরা যখন অভাবের তাড়নায় বা সম্মানের অভাবে প্রাইভেট টিউশনি বা অন্য কোনো পেশার দিকে ধাবিত হন, তখন উচ্চশিক্ষার মৃত্যু ঘটে।
বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ: সরকারি বনাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়এই বিশৃঙ্খলা থেকে উত্তরণের পথ হলো একটি শক্তিশালী এবং স্বাধীন কমিশন গঠন করা। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির সমন্বয়ে এমন একটি নতুন কমিশন দরকার, যা কেবল আমলাতান্ত্রিক কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে চলবে না।
এই কমিশনের মূল কাজ হবে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে শিক্ষকদের জন্য একটি জাতীয় বেতন স্কেলের আদলে ন্যূনতম বেতনকাঠামো নির্ধারণ করে দেওয়া, পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এবং উচ্চশিক্ষার জন্য বাধ্যতামূলক ছুটির ব্যবস্থা রাখা। একই সঙ্গে ট্রাস্টের তহবিল কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে সেই অর্থের কত শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কঠোর অডিট হওয়া প্রয়োজন।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যদি পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং মানসম্মত শিক্ষক সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে তাদের ডিগ্রি প্রদানের অনুমতি বাতিল করার মতো কঠোর অবস্থান কমিশনকে নিতে হবে। ইউজিসিকে কেবল নামমাত্র তদারকি নয়, বরং একটি স্বাধীন আইনি ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে, যেন তারা রাজনৈতিক বা মালিকপক্ষের চাপের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে।
শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ‘ম্যানেজ’ করার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা অবশ্যই বিনিয়োগ করবেন এবং তার সম্মান পাবেন, কিন্তু সেই বিনিয়োগ যেন শিক্ষাকে স্রেফ পণ্য বানিয়ে না ফেলে। শিক্ষকদের মর্যাদা এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল অগ্রাধিকার।
বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের নিবেদন—আসুন, উচ্চশিক্ষার এই মেরুদণ্ডকে সোজা করার উদ্যোগ নিই। একটি সুনির্দিষ্ট কমিশন গঠনের মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিশৃঙ্খলা দূর করে সেখানে একটি একাডেমিক শৃঙ্খলা ও বিশ্বমান নিশ্চিত করুন। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো আপস চলে না। যদি আমরা শিক্ষকদের মেধার অবমূল্যায়ন করি, তবে জাতি হিসেবে আমরা মেধাহীন হয়ে পড়ব।
শেষে বলা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অপরিহার্যতাকে পুঁজি করে একধরনের স্বেচ্ছাচারিতা জেঁকে বসেছে। এই স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ না করলে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হীনম্মন্যতায় ভুগবে না এবং শিক্ষকেরা অভাবের তাড়নায় দাপ্তরিক কাজ বা প্রাইভেট টিউশনির পেছনে না ছুটে গবেষণাগারে বা শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দেবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির বলিষ্ঠ ভূমিকা এবং একটি নতুন শক্তিশালী কমিশনের মাধ্যমেই কেবল উচ্চশিক্ষার এই হারিয়ে যাওয়া গৌরব ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। নতুবা আগামীর ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাই হতে পারে স্মার্ট ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।
আলমগীর মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক
মতামত লেখকের নিজস্ব