জীবনব্যাপী শিক্ষাজট কি চলতেই থাকবে
· Prothom Alo

অভিনয়শিল্পী বিপাশা হায়াত নববর্ষের আগে একটি মিডিয়াকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেশনজটের কারণে মাস্টার্সসহ চারুকলায় তাঁদের ১২ বছর পড়তে হয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এককালে এমনই ছিল!
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শুরুতে আমরা এ ব্যবস্থাকে বলতাম ‘সেশনজট’। কিন্তু শেষে বুঝেছিলাম, এটা প্রকৃতপক্ষে ‘শিক্ষাজট’! বুঝেছিলাম, এরই নাম অচলায়তনিক ব্যবস্থা, যা আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার মতো বিদ্যায়তনেও হুবহু বলবৎ থাকে।
Visit biznow.biz for more information.
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী এই জটের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তির তাক করেছেন এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার দিকে। সেই সূত্রে কোচিং ব্যবসারও রাশ টানতে চেয়েছেন। অত্যন্ত ইতিবাচক ব্যাপার। এই দুই পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষাবর্ষের মধ্যে নেওয়ার উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সমর্থনযোগ্য। তবে সার্বিকভাবে সমস্যাটিকে আরও বিশদে দেখার সুযোগ আছে।
শিক্ষাজট: প্রাক্-প্রাথমিক
আমরা বিদ্যার্জনকে মূলত শিক্ষার হাতে সোপর্দ করেছি। ‘শিক্ষা দেওয়ার’ নামে শিশুমনে আনন্দের বদলে সৃষ্টি করেছি অন্তর্জ্বালা ও ভীতি। সেটাই প্রকৃতপক্ষে হয়ে উঠেছে ‘উচিত শিক্ষা’, বিদ্যার্জন থেকে যার যোজন দূরত্ব।
এই প্রক্রিয়া শুরু হয় প্রাক্-প্রাথমিকে। বিশেষত বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোয়। এই বিদ্যালয়গুলো সব আমলেই সরকারি ‘নজরদারি’র বাইরে থাকে। তারা প্রাক্-প্রাথমিকে নিজেদের মর্জিমাফিক যে পাঠ্যক্রম পড়ায়, তা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অন্তত তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ানোর সমানুপাতিক। প্রাক্-প্রাথমিকের নামে শিশুর মানসিক বিকাশবিরোধী এই পুস্তকচাপ অভাবনীয় অপরাধের সমান।
এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা প্রথম শ্রেণিতে ওঠার আগেই মোটামুটি তিনটি শ্রেণিতে পড়ে। বইয়ের ভারে শিশুর ঝোলা তো ঝুলেই, শরীরটাও হেলে পড়ে! আদতে এগুলো শিক্ষা নয়, শিক্ষাব্যবসার বন্দোবস্ত। এ বন্দোবস্ত শিশুর মানসিক বিকাশে কোনো সাহায্য করে না; বরং প্রারম্ভেই শিক্ষাকে একটি ভীতিকর বিষবৃক্ষে পরিণত করে।
প্রাক্-প্রাথমিক মূলত শিশুর চিত্তবিনোদন ও পরিবার থেকে সামাজিক পরিসরে পদার্পণ করতে শেখার প্রথম ধাপ হিসেবে গণ্য হয়, যার সঙ্গে প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা চাপের কোনো সম্পর্ক নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশংসনীয় কাজ করছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। প্রাক্-প্রাথমিক শিশুদের কোনো চাপই নেই। তারা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করে ছয় বছর বয়সে, প্রথম শ্রেণির জন্য প্রযোজ্য সহজপাঠ্যে। সরকার প্রণীত পাঠ্যক্রম ও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ বিদ্যালয়গুলোয় আদতেই শিশুযোগ্য করে তুলেছে।
অথচ বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো গেছে উল্টো পথে। পরীক্ষাকেন্দ্রিক পুস্তকের ভারে তারা শৈশবের আনন্দকে ভূলুণ্ঠিত করছে। কারণ, তাদের আছে শিক্ষাব্যবসার উন্নততর প্রকৌশল। শিশুর ওপর যত চাপ, শিক্ষাব্যবসায়ীদের তত বৈষয়িক লাভ—কোচিং ব্যবসার উন্মুক্ত দ্বার! অভিভাবকদেরও সেটাই পছন্দ বৈকি!
আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরুর আগে প্রাক্-প্রাথমিকের আদর্শবিরোধী এই বাংলাদেশি সংস্করণকে ‘প্রাক্-শিক্ষাজট’ বলা উচিত। কারণ, জীবনের এ সময়টিতে যা করণীয়, তা করতে আমরা শিশুদের বাধা দিচ্ছি এবং বিপরীতে ‘উপহার’ দিচ্ছি পুস্তকের বোঝা। সময়ের এই অনভিপ্রেত অপচয় তাই অনিবার্যভাবেই একটি শিক্ষাজট। উচ্চ শ্রেণির পাশাপাশি এই ব্যবসাভিত্তিক প্রাক্-শিক্ষাজট নিরসনকল্পেও শিক্ষাকর্তাদের আশু পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক
প্রাক্-শিক্ষাজটে জীবনের প্রথম দুই-তিন বছর বিনষ্ট হওয়ার পর সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে নবম থেকে ত্রয়োদশ শ্রেণির মধ্যবর্তী সময়ে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত আমাদের শিক্ষাবর্ষ মূলত বর্ষপঞ্জি অনুসারী। অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এক শিক্ষাবর্ষ। এ হিসাবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষাকাল চতুর্বর্ষে সম্পন্ন হওয়ার কথা। অথচ বর্তমান ব্যবস্থায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হচ্ছে নিজস্ব শিক্ষাবর্ষের বাইরে, যে সময়টা মূলত উচ্চতর স্তরের জন্য বরাদ্দকৃত।
নতুন সহস্রাব্দে গ্রেডিং পদ্ধতির প্রায় শুরুর দিকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম আমরা। পরীক্ষা হলো মার্চ মাসে, ফল পেলাম জুন মাসে। উচ্চমাধ্যমিকের ক্লাস শুরু হলো সেপ্টেম্বর মাসে। মানে ব্যবস্থার ত্রুটিতে উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের ৯ মাস তত দিনে শেষ হয়ে গেছে।
এ হিসাবে, বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিকের দুই বর্ষ শেষ করতে হাতে সময় ছিল মাত্র ১৫ মাস। কিন্তু ব্যবস্থা-প্রণীত শুভংকরের ফাঁকির সুযোগে আমরা পরীক্ষা দিলাম ক্লাস শুরু হওয়ার ২০ মাস পর, মে-জুন মাসে। ফল প্রকাশ হলো সেপ্টেম্বর মাসে। তত দিনে ত্রয়োদশ শ্রেণি তথা স্নাতক প্রথম বর্ষের খাত থেকে তিন মাস চলে গেছে।
ইতিবাচক ভাবুকেরা অবশ্য বলবেন, ক্লাস শুরু থেকে ফল পাওয়া—কী চমৎকারভাবেই না ঠিকঠাক ২৪ মাসের মধ্যে আমরা উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে গেলাম! অথচ তাঁরা ভেবে দেখবেন না, সেকালে মাধ্যমিকের ১১টি বিষয়ের (বাংলা-ইংরেজি দুই পর্ব মিলিয়ে) একই পুস্তক পড়ে পরীক্ষা দিতে ২৭ মাস লাগলেও উচ্চমাধ্যমিকের দুই বর্ষে ছয়টি বিষয়ের মোট ১২টি স্বতন্ত্র পর্ব এবং দ্বিগুণ আয়তনের অধিকতর কঠিন সিলেবাস শেষ করতে হয়েছিল মাত্র ২০ মাসে!
ভর্তিযুদ্ধ শেষে স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হলো মার্চ মাসে। তত দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই-জুন শিক্ষাবর্ষের হিসাব থেকে মোট ৯ মাস অস্তাগত। সর্বসাকল্যে নবম থেকে ত্রয়োদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর আগে ৪৮ মাসের পরিবর্তে উত্তরণকাল (ট্রানজিশন পিরিয়ড) সাপেক্ষে আমাদের গেছে ৬৩ মাস। ব্যবস্থার বদৌলতে কালক্ষেপণ ১৫ মাস!
অথচ মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক নির্ধারিত চার পঞ্জিকাবর্ষে শেষ করতে পারলে, ব্যবস্থার ফাঁক গলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শ্রেণির ভর্তি ও ক্লাস শুরুর জন্য অন্তত ছয় মাস সময় হাতে থাকার কথা। সেটা আজ পর্যন্ত আমরা রক্ষা করতে পারিনি।
উচ্চশিক্ষা
উত্তরণকালের কালক্ষেপণ কিছুটা কমলেও এখনো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অবস্থা শোচনীয়ই রয়ে গেছে। শুধু স্নাতক শুরুর আগেই ১২ মাসের কোনো হিসাব নেই। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা হলো সবে এপ্রিল মাসে। সব প্রক্রিয়া শেষে ক্লাস শুরু হতে জুন-জুলাই মাস, মানে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ পড়ে যাবে। অথচ তখন তাঁদের দ্বিতীয় বর্ষ শুরু হওয়ার কথা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে এ জন্যই বিশেষভাবে কথা বলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাবর্ষের ব্যাপ্তি জুলাই থেকে জুন মাস। বেসরকারিগুলোয় দুই বা তিন সেমিস্টার হিসাবে মোটাদাগে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাস। পাবলিকে বছরে একবার ভর্তি পরীক্ষা হয়। বেসরকারিতে হয় প্রতিটি সেমিস্টারেই এবং নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষাও হয় বেশি। এত আয়োজনের পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জট নেই, চার বছরের কোর্স চার বছরেই শেষ হয়।
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক পড়ান। সেখানে যদি তাঁরা শিক্ষাপঞ্জি (একাডেমিক ক্যালেন্ডার) মান্য করতে পারেন, তাহলে স্ববিশ্ববিদ্যালয়ে পারেন না কেন? স্ববিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য ও সপ্তাহান্ত কোর্স যদি যথাসময়ে শেষ করতে পারেন, তাহলে নিয়মিত কোর্স কেন পারেন না? এর অন্যতম কারণ, শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব এবং বিশ্ববিদ্যালয়–ব্যবস্থার অন্দরে লুক্কায়িত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। তবু কথা আছে।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষাজট-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিততে পারলে আরেকটি বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁবু গেড়ে বসা এই দুষ্টচক্রীয় শিক্ষাজটকে পরাভূত করতেই হবে। জাতীয় স্বার্থেই এই জীবনব্যাপী দুষ্টচক্র থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ গবেষণা হলেও আমাদের কোনো স্বতন্ত্র গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। আমরা স্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে তুলেছি মূলত পাঠনকেন্দ্রিক (টিচিং-সেন্ট্রিক) প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যারা একটু-আধটু গবেষণা করবে! ফলে সারা বছর পরীক্ষা গ্রহণ আর উত্তরপত্র মূল্যায়ন (বহিরাগত পরীক্ষক হওয়াসহ) যখন শিক্ষকদের প্রধান কাজ হয়ে যায়, তখন গবেষণা ঠিকঠাক হবে না, এটাই স্বাভাবিক। আদতে পঠন–পাঠন ও গবেষণার কিছুই ঠিকঠাক হয়ে ওঠে না প্রচলিত ব্যবস্থার কারণেই।
এই ‘বেনিফিট অব ডাউটে’র পরও শিক্ষকেরা দায় এড়াতে পারেন না। নৈপুণ্যকলা বা চারুকলা অনুষদভুক্ত বিভাগগুলোর অবস্থা তো আরও খারাপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাপর বিভাগের তুলনায় এগুলো প্রায় দুই বছর পিছিয়ে থাকে। অথচ কেন্দ্রীয় শিক্ষাপঞ্জি মানলে একই শিক্ষাবর্ষের সব বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষা-ফলাফল একই দিনে সম্পন্ন হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
নির্মম বাস্তবতা হলো, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েট সিভিতে গ্র্যাজুয়েশনের সাল শিক্ষাবর্ষ অনুযায়ী লিখলেও তাঁদের পরীক্ষা ও পাসের সালটি অন্তত এক-দুই বছর পরের বলে অনুমান করা যায়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এসব নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, ‘স্ট্যাডি গ্যাপ’ নিয়ে প্রশ্ন করলে বিব্রতও হতে হয়!
প্রশাসক-শিক্ষকেরা হয়তো ক্যাম্পাসগুলোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির দায় দেবেন। সে ক্ষেত্রে খুব দূরদেশে যেতে হবে না। খোদ ভারতেই, ডিসিপ্লিন যেটাই হোক, জুলাই থেকে জুন মাসের মধ্যেই ক্লাস-পরীক্ষা-ফলাফল সম্পন্ন হয়ে যায়। ভারতের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় রাজনীতি নেই? ভারতে যেতে না চাইলে, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপঞ্জি থেকেই অনুপ্রেরণা নিতে পারে।
আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় স্নাতক-স্নাতকোত্তর মিলিয়ে ছয়-সাত বছর পড়ানো হয়। এ বাবদ অতিরিক্ত সময় অপচয় করে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি রাষ্ট্রেরও বিপুল আর্থিক ক্ষতি করা হচ্ছে। একটি গরিব দেশের এই বিলাসিতা বন্ধ করতে হবে। এই অর্থ অনায়াসে গবেষণায় বরাদ্দ করা যেত। সে সূত্রেই পাঠনকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেলে স্নাতকোত্তর শ্রেণিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা জরুরি। স্নাতক হলেই যেখানে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরি করা যায়, সেখানে স্নাতকোত্তরের নামে শিক্ষাজীবন আরও প্রলম্বিত করা আদতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজটে পতিত করারই শামিল।
কেউ শিক্ষা-গবেষণা ও পাঠদানে সম্পৃক্ত হলেই কেবল রাষ্ট্রের দায় আছে বিশেষায়িত গবেষণাকেন্দ্রিক স্নাতকোত্তর পড়ানোর। অন্যদের ক্ষেত্রে এটি অনিবার্যভাবেই অহেতুক ব্যয়। এ প্রসঙ্গে বহু আগেই উচ্চশিক্ষার কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছিলাম (দ্রষ্টব্য: পৃষ্ঠা ৫, দৈনিক প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০২৪)। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও স্নাতকোত্তর প্রসঙ্গে একই কথা বলেছেন। শিক্ষামন্ত্রীও কি তা মনে করেন না?
সমাধান প্রস্তাব
কর্তাদের খামখেয়ালিপনা ও ব্যবস্থার জটিল সমীকরণ কয়েক প্রজন্মের বহু অযাচিত সময় নষ্ট করেছে। শিক্ষাজীবনে এই সমীকরণ নিয়ে আমরাও চিন্তা করেছি, কিন্তু সমাধানদাতা কেউই আসেননি। অবশেষে বর্তমান প্রজন্মের জন্য ত্রাতা হলেন স্বয়ং শিক্ষাতন্ত্রের নেতা। এটি আশাবাদী হওয়ার মতো খবর। সমাধানকল্পে তাই তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
প্রথমত, বাংলাদেশ ২০ বছর আগের দেশ নেই। সেই নকল-মহামারিও নেই। ফলে অভিযানভীতিও আবেদন হারিয়েছে। ইন্টারনেট আর অ্যাপের যুগে বাংলাদেশের মূল সমস্যা এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস। এবারের এসএসসি পরীক্ষাকালেই এসব গুজব রটেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনের কুশীলব কোচিং ব্যবসার সিন্ডিকেটগুলো। কোচিং নামে গলার কাঁটা সরানো তাই জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিকের নামে চালুকৃত ব্যবসায়িক মডেল তথা প্রাক্-শিক্ষাজট বন্ধ করতে সরকার প্রণীত পাঠ্যক্রম হুবহু অনুসরণে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে নেওয়াটা অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার সৃষ্টি করবে। এই শিক্ষার্থীরা সাম্প্রতিক কালে রাজনৈতিক কারণে নানা চড়াই-উতরাই পার করেছে। জীবনের প্রথম বড় পাবলিক পরীক্ষার আগে তারা যেন ট্রমায় না পড়ে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। খুব বেশি হলে এক মাস এগিয়ে আনা যায়। বরং ২০২৮ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি কিছুটা সমন্বয় করা অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে।
এভাবে ক্রমান্বয়ে সমন্বয় সাধন করে মূল লক্ষ্য হবে ২০২৭-২৮ শিক্ষাবর্ষ। এই শিক্ষাবর্ষের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতেই হবে। এ লক্ষ্যে এসএসসি পরীক্ষা সেপ্টেম্বর মাসে ও এইচএসসি পরীক্ষা অক্টোবর মাসে আয়োজন করে দুই মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করতে পারলে, যথাযথভাবে পরবর্তী শিক্ষাস্তর শুরুর জন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যথেষ্ট সময় পাবে।
চতুর্থত, এসএসসি-এইচএসসির সমন্বয় সাধিত হলে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ভর্তির সব প্রক্রিয়া জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সম্পন্ন করে অনায়াসেই জুলাই মাস থেকে শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে পারবে (ক্লাস শুরুর আগের তিন-চার মাস শিক্ষার্থীরা জীবনদক্ষতা বৃদ্ধিতে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে পারে)। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষাপঞ্জি আবশ্যিকভাবে মান্য করে সব অনুষদের সব বিভাগকে প্রতিটি বর্ষের বা প্রতিটি সেমিস্টারের ক্লাস-পরীক্ষা-ফলাফল যথাক্রমে ১২ বা ৬ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। প্রয়োজনে বহিরাগত বা দ্বিতীয় পরীক্ষক ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে হবে।
শেষ কথা
আজ থেকে আড়াই দশক আগে (২০০১ সালে) শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এহছানুল হক মিলন নকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সেই সময়টির জন্য তিনি আজও স্মরণীয়। সেই সময়ের প্রথম কয়েক বছর গ্রেডিং পদ্ধতির অব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্তহীনতা এবং কারিকুলাম পরিবর্তন নিয়ে অবশ্য সমালোচনাও আছে। তবে সব ছাপিয়ে তাঁর নকলবিরোধী হেলিকপ্টার অভিযান যুগবদলের হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশে।
এবার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে শিক্ষাজট-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিততে পারলে আরেকটি বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁবু গেড়ে বসা এই দুষ্টচক্রীয় শিক্ষাজটকে পরাভূত করতেই হবে। জাতীয় স্বার্থেই এই জীবনব্যাপী দুষ্টচক্র থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি প্রয়োজন।
ড. সৌমিত জয়দ্বীপ সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব