রঘু রাই: এক মহান শিক্ষক
· Prothom Alo

সম্প্রতি চলে গেলেন রঘু রাই। গুণী একজন আলোকচিত্রী। গত দুই বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২৬ এপ্রিল ২০২৬ তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
রঘু রাইয়ের কাজ বহুমাত্রিক। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর অসামান্য দরদ দিয়ে ছবি তুলেছেন। যুদ্ধের গভীর ক্ষত বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করেছিলেন। রঘু রাইয়ের ছবি কেবল কোনো ঘটনা বা বিষয়ের মুহূর্তের ডকুমেন্ট নয়, বরং এটি ইতিহাসের প্রবহমান সত্তা।
Visit biznow.biz for more information.
রঘু রাইয়ের তিনটি বিশেষ দিক দারুণ আকর্ষণ করে; এক. তাঁর বিষয়ের প্রতি নিবিষ্টতা, দুই. দরদি মন, তিন. ক্যামেরার কারিগরি কৌশল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন—সৃষ্টির প্রতিটি অনুষঙ্গের ভেতর রয়েছে বিশেষ ধরনের সম্মোহনী গুণ। একজন ফটোগ্রাফারের কাজ হলো সেই গুণ মেলে ধরা। তাঁর বিবেচনায় ছবি কেবল বিষয়বস্তুর যথাযথ উপস্থাপন নয় বরং এর ভেতর যে স্পিরিট ও নান্দনিকতা থাকে তা ফুটিয়ে তোলা।
রঘু রাই বিষয়ের গভীরে যেতেন। রঘু রাই এবং বিষয় একাকার হয়ে যেত। তিনি ছবি তোলার ক্ষেত্রে কখনো আউটসাইডার ছিলেন না, ছিলেন ইনসাইডার। ফলে মহাকাব্যিক সব ছবি তাঁর পক্ষে তোলা সম্ভব হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী, কিংবা ভূপাল গ্যাস চেম্বার দুর্ঘটনা, কলকাতার রাস্তা, তাজমহল, ইন্দিরা গান্ধী বা মাদার তেরেসা—সব ছবি তুলেছেন ইনসাইড থেকে, স্পিরিট থেকে।
কী গভীর দেখা রঘু রাইয়ের? কেবল দেখা নয়, তীক্ষ্ণ চোখ দিয়ে দেখা। বিষয়ের অন্তর্জগতে ঢুকে ক্যামেরার সাহায্যে সারবত্তা ছেঁকে আনা। তাঁর ছবির আরেকটি বিশেষ দিক হলো বিন্যাস, পশ্চার ও পজিশন। তাঁর ছবি কেবল আলোছায়ার দ্যুতিময় বিন্যাস নেই বরং বহুমাত্রিকতার বর্ণিল। তাঁর ছবি কখনো মায়া জাগায়, কখনো বিক্ষুব্ধ করে, কখনো অনুভবের নৈকট্য দেয়, কখনো–বা নির্মল প্রশান্তি আনে।
স্মরণে রঘু রাই: এক আলোকময় যাত্রারঘু রাইয়ের ব্যাপ্তি কেবল ফটোগ্রাফার বর্গের ভেতর নয়। তিনি শেখান কত নিবিষ্ট মনে জগৎ সংসারের অনুষঙ্গগুলো দেখতে হবে। কারণ, দেখতে না শিখলে অনুভব তৈরি হবে না। আর অনুভব তৈরি না হলে সংযুক্তি হবে না।
রঘু রাইয়ের দেখা ও চিন্তা দার্শনিকতায় ভরপুর। তাঁর একটি বিশেষ বিষয় ছিল তিনি যেমন বড়তে নিবিষ্ট ছিলেন, একইভাবে ক্ষুদ্রেরও সাধনা করতেন। তিনি মূলত দার্শনিক ফটোগ্রাফার। কারণ, যা দৃশ্যমান অর্থ প্রকাশ করে তাই তো দর্শন (দৃশ+অনট)। রঘু রাই দৃশ্যায়নের মহাজন। জগৎ সংসারের বহু প্রকরণ তাঁর হাতের ছোঁয়ায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। একটি প্রাণহীন বিষয়ের ভেতরও যে দ্যুতি থাকে, গতি থাকে, শক্তি থাকে, তিনি তা দারুণভাবে তুলে ধরছেন।
ছবিমেলায় আলোকচিত্রীদের সঙ্গে কথা বলছেন ভারতের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী রঘু রাই।রাজধানীর জার্মান কালচারাল সেন্টারে।ছবি তোলার ক্ষেত্রে রঘু রাইয়ের যে মানসিক প্রস্তুতি, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি উত্তরপ্রজন্মকে যেমন ছবি তোলার কারিগরি দিক সম্পর্কে শিখিয়েছেন, একই সঙ্গে শিখিয়েছেন এর মর্মগত দিক ধরতে। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমার কাছে ছবি তোলা একটি দর্শন, ছবি তোলার জন্য শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ঘটনার বা মুহূর্তের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে। কেবল তাই নয়, অনুষঙ্গ বা বিষয়ের নৈকট্য তিনি পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন—কেউ যদি বিষয়ের কাছাকাছি না যায় তাহলে ভালো ছবি পাবে না।
ছবি তোলার ব্যাপারটি কেবল কারিগরি বিষয় নয়, এর জন্য নিজস্ব মনোভঙ্গি অর্জন করতে হয়। তিনি স্বজ্ঞার ওপর জোর দিয়েছেন। এ স্বজ্ঞাবোধ দিয়ে তিনি বিষয়ের গূঢ় রহস্যগুলো উন্মোচন করেছেন। তাঁর মন্তব্য কোনো বিষয়ের গূঢ় রহস্যটি যদি উন্মোচন না করা যায় তাহলে একটি ছবি একটি তথ্য হিসেবে থেকে যাবে।
রঘু রাই ক্যামেরার কবিঅর্থাৎ রঘু রাইয়ের ছবির দার্শনিকতা হলো তিনি ছবিকে ছবির গতানুগতিক অর্থের ভেতর রাখেননি। তিনি ছবির অর্থকে উন্মুক্ত করেছেন। ছবি অন্তর্নিহিত গুণ উন্মোচনের ওপর জোর দিয়েছেন। ছবির গতানুগতিক অর্থ অবমুক্ত করেছেন। স্বজ্ঞাবোধ দিয়ে যখন একটি ছবির নির্মাণ হয় তখন তা কেবল তাৎক্ষণিক কোনো বিষয়ের তথ্য হয়ে ওঠে না, বরং হয়ে ওঠে এক কালজয়ী স্মারক।
ফটোগ্রাফির জন্য গতানুগতিক কোনো গ্রামারে রঘু রাইয়ের আস্থা ছিল না। তিনি হৃদয় দিয়ে চিন্তা ও দেখার পক্ষে রায় দিয়ে গেছেন। স্বকীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বিনয় ও সখ্যবোধ ছিল তাঁর একটি বিশেষ গুণ। তিনি তরুণ ফটোগ্রাফারদের উৎসাহিত করতেন, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের জন্য পরামর্শ দিতেন। তাঁর প্রকাশের ভেতর এক বিনয়ী ও পরিমিতিবোধ লক্ষ করা যায়। তিনি সহাস্য ছিলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন ও দেখতেন। তারপর প্রকাশ করতেন।
রঘু রাই। ফটো ক্রেডিট: ম্যাগনাম ফটোসকেবল দেশের সীমানার মধ্যে নয়, রঘু রাইয়ের ব্যাপ্তি ছিল পৃথিবীব্যাপী। তিনি যেমন ভারতের চতুর্থ সর্বোচ বেসামরিক পদক পদ্মশ্রী পেয়েছেন, একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তিনি ম্যাগনাম ফটোস-এ কাজ করেছেন। কাজ করেছেন ফরাসি প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার হেনরি কার্টিয়ার ব্রেসনের সঙ্গে। হেনরি কার্টিয়ার ব্রেসন হলেন সেই উচ্চতার ফটোগ্রাফার, যিনি ফটোগ্রাফিতে ডিসাইসিভ মোমেন্ট ধারণার জন্ম দেন। অতি অল্প সময় বা ফ্রাকশন অব সেকেন্ডের মধ্যে ক্যামেরায় সাবজেক্ট ধরার বিষয়কে তিনি ডিসাইসিভ মোমেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। রঘু রাই অনেকবার এ কৌশল কাজে লাগিয়ে দারুণ সব ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টেশন করেছেন।
রঘু রাই একজন শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল স্টোরি টেলার। ভারতের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও জনজীবনের অসামান্য ডকুমেন্টেশন করে গেছেন। রঘু রাই তাঁর কাজ, যাপিত জীবন ও দার্শনিকতা দিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় সব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
রঘু রাই উত্তরপ্রজন্মের শেখার মূল জায়গা হলো সংস্কারমুক্তভাবে দেখা। ছোট-বড় সবকিছু নিবিষ্টভাবে দেখা। গভীরভাবে দেখতে পারলেই মমত্ব তৈরি হয়, বোধ তৈরি হয়। আর এ মমত্ব তৈরি করে সংযুক্তি ও সংহতি। রঘু রাইয়ের জীবনদর্শনের বিশেষ দিক দেখা গভীরভাবে দেখা ও বিষয়ের অন্তর্নিহিত গুণ তুলে ধরা।
রঘু রাইয়ের কাজ শ্রেণি, ধর্ম, বর্ণ, পেশা নির্বিশেষে সর্বব্যাপী ভালোবোধ তৈরি করে। তিনি ফটো সাধনার মধ্য দিয়ে মূলত যে দর্শন চর্চা করেছেন তা হলো সংযুক্তির দর্শন, বোধের দর্শন ও নান্দনিকতার জয়গান। এ বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যিনি উপহার দেন তাঁর চেয়ে মহান শিক্ষক আর কে হতে পারেন। রঘু রাই এমন একজন মহান শিক্ষক।
রঘু রাই ফটোগ্রাফির জগতে কেবল একটি ফেনোমেনাল চরিত্র নয়, একটি স্বতন্ত্র ধারা। তাঁর প্রতি বাংলাদেশের ঋণও কম নয়। রঘু রাইয়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
খান মো. রবিউল আলম যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক