পারমাণবিক বিদ্যুৎ, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সক্ষমতায় শীর্ষে কোন ১০ দেশ
· Prothom Alo
বিশ্বে বিদ্যুতের চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে নিম্ন কার্বন নিঃসরণকারী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানির খোঁজ। এই প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পালাবদলের ইঙ্গিত মিলছে।
Visit newssport.cv for more information.
বিদ্যমান ও পরিকল্পনায় থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক সক্ষমতায় শীর্ষে উঠে আসবে চীন। ফলে জ্বালানি রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির মোট সক্ষমতা ১ লাখ ২ হাজার ৪৭৫ মেগাওয়াট; দ্বিতীয় স্থানে থাকা ফ্রান্সের তুলনায় ৩৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। চীন বর্তমানে ৬০ হাজার ৮৯৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা নিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকলেও নতুন কেন্দ্র চালু হলে চিত্র বদলে যাবে।
সব পরিকল্পিত প্রকল্প শেষ হলে চীনের সক্ষমতা বেড়ে হতে পারে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট। তখন যুক্তরাষ্ট্র থাকবে দ্বিতীয় অবস্থানে, যাদের সম্ভাব্য সক্ষমতা হবে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯১০ মেগাওয়াট। ফ্রান্সের সক্ষমতা দাঁড়াতে পারে ৭৫ হাজার ৫৯০ মেগাওয়াটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিও স্থিতিশীল হবে। একসময় অনেক দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করলেও জীবাশ্ম জ্বালানির প্রাপ্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ আবার পারমাণবিক বিদ্যুতে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করছে।
দেখে নেওয়া যাক, বিদ্যমান ও পরিকল্পিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কোনগুলো। তালিকাটি প্রণয়ন করেছে ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট।
কানাডা
বর্তমানে কানাডার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৪ দশমিক ৬ গিগাওয়াট, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট। কানাডার পারমাণবিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো পূর্ণাঙ্গ। তারা পরিবেশ ও নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়। সেই সঙ্গে বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিবর্তে মূলত রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগী।
উগান্ডা
বর্তমানে উগান্ডার পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা নেই। তবে ভবিষ্যতে তারা ১৮ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তারা একলাফে অনেকটা এগিয়ে যেতে চায়। তারা প্রযুক্তিনির্ভর জ্বালানি পরিককল্পনা করছে। তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ অনেক।
জাপান
জাপানের বর্তমান সক্ষমতা ১৩ দশমিক ৩ গিগাওয়াট। ভবিষ্যতে তাদের আরও ৬ দশমিক ৬ গিগাওয়াট উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা আছে। দেশটির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, জনমত ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, বিশেষ করে ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটি বর্তমানে সংকট উত্তরকালীন পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।
ইউক্রেন
বর্তমানে ইউক্রেনের উৎপাদন সক্ষমতা ১৩ দশমিক ৮ গিগাওয়াট। তাদের পরিকল্পনা হলো, ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও ৮ দশমিক ৪ গিগাওয়াট বৃদ্ধি করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোই জাতীয় শক্তির মূল ভরসা।
দক্ষিণ কোরিয়া
এশিয়ার উন্নত এ দেশের বর্তমান সক্ষমতা ২৭ দশমিক ১ গিগাওয়াট; তবে ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলনামূলক সীমিত, মাত্র ৫ দশমিক ৬ গিগিওয়াট। দক্ষিণ কোরিয়ার আছে উচ্চ প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও রপ্তানিযোগ্য পারমাণবিক প্রযুক্তি।
ভারত
ভারতের বর্তমান সক্ষমতা মাত্র ৮ দশমিক ২ গিগাওয়াট, তবে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনেক বেশি। ভবিষ্যতে তারা ৩১ দশমিক ৫ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৩৯ দশমিক ৭ গিগাওয়াট। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ভারতের প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। ফলে তার বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে তারা জীবাশ্ম জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে তারা মনোযোগ দিচ্ছে।
রাশিয়া
রাশিয়ার বর্তমান সক্ষমতা ২৮ দশমিক ৬ গিগাওয়াট, তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ৩২ দশমিক ২ গিগাওয়াট। অর্থাৎ এখন তারা যত পরিমাণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, ভবিষ্যতে তার চেয়ে বেশি করবে। রাশিয়া নিজ দেশে উৎপাদনের পাশাপাশি পারমাণবিক প্রযুক্তি রপ্তানি করে থাকে। সেই সঙ্গে বিদেশে রিঅ্যাক্টর নির্মাণের মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির নীতি আছে তাদের। বাংলাদেশের রূপপুরে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, তা নির্মিত হচ্ছে রাশিয়ার সহায়তায়।
ফ্রান্স
ফ্রান্সের সক্ষমতা ৬৫ দশমিক ৭ গিগাওয়াট। ইউরোপের মধ্যে তারাই সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে তাদের নতুন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা সীমিত, মাত্র ৯ দশমিক ৯ গিগাওয়াট। এর অর্থ হলো, পারমাণবিক শক্তি এখনো তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর মেরুদণ্ড; কিন্তু বড় ধরনের সম্প্রসারণের পরিবর্তে স্থিতিশীলতার নীতিতে চলছে তারা। তাই ফ্রান্সকে পারমাণবিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল স্থিতিশীল মডেল হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সক্ষমতা ১০২ দশমিক ৫ গিগাওয়াট; এখন পর্যন্ত যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। তবে তাদের নতুন প্রকল্প তুলনামূলকভাবে সীমিত, মাত্র ১৫ দশমিক ৪ গিগাওয়াট। এখানে একধরনের কাঠামোগত বাস্তবতা দেখা যায়। সেটা হলো, দেশটির পুরোনো রিঅ্যাক্টরভিত্তিক শক্তিশালী পারমাণবিক ভিত্তি আছে, কিন্তু নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। সেই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকেও ঝুঁকে পড়ছে দেশটি। ফলে ভবিষ্যতে এই খাতে নেতৃত্বের আসন হারাতে পারে দেশটি।
চীন
চীনের বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬০ দশমিক ৯ গিগাওয়াট। তবে ভবিষ্যৎ প্রকল্পের আকার প্রায় ১২৪ দশমিক ৯ গিগাওয়াট। এখন তাদের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা সবচেয়ে বেশি। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; বরং জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমানো, কার্বন নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশলও বটে। ফলে চীন ধীরে ধীরে অন্যান্য খাতের মতো এই খাতেও বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে বসতে যাচ্ছে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।