সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দুদের আসনে কি শেষ হাসি হাসতে পারবেন মমতা

· Prothom Alo

অশান্তির আশঙ্কায় ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ার সভা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, রোববার সেখানেই পদযাত্রা করলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তবু থামছে না কানাকানি। নিজের খাসতালুকে প্রতিপক্ষের চাপে মুখ্যমন্ত্রী কেন ওভাবে চলে যাবেন? তাহলে কি তৃণমূল নেত্রী দেয়াললিখন পড়ে ফেলেছেন? এত দেখে দেখে ব্যাকফুটে খেলছেন? কানাকানি হচ্ছে জায়গাটা ভবানীপুর বলে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গতবার, মানে ২০২১ সালের ভোটে নন্দীগ্রামে হেরে এই ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা। জিতেছিলেন ৫৪ হাজার ভোটের ব্যবধানে। অথচ এবার মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার ভোটারের ভবানীপুরে কাটা গেছে ৫১ হাজার নাম। তাঁর ঘরের উঠোনে টক্কর দিতে এসে তাঁরই পক্ষপুটে লালিত বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী গলা উঁচিয়ে নিয়ম করে বলে চলেছেন, ‘আমি মোদিজির দূত। মোদিজিই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন আপনার বিদায়ের ঘণ্টা বাজাতে। সেই ঘণ্টা ৪ মে বাজবে। এখন সভা ছেড়ে পালাচ্ছেন। সেদিন পালাতে হবে দেশ ছেড়ে। দুবাইয়ের টিকিট কেটে রাখুন।’

পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুর আসনের একবালপুর এলাকায় মমতার প্রতি সমর্থন প্রশ্নাতীত। ২৬ এপ্রিল ২০২৬, কলকাতা

সভা ছেড়ে মমতা চলে গিয়েছিলেন গত শনিবার। ভবানীপুরের ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে, চক্রবেড়িয়ায় মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল। কিছুটা দূরে সভা ছিল বিজেপির। তাদের কয়েকটা লাউডস্পিকার টাঙানো হয়েছিল মমতার সভার দিকে মুখ করে। মুখ্যমন্ত্রী ভাষণ দিতে শুরু করেছেন কি করেননি, বিজেপির সভা থেকে গাঁক গাঁক করে স্লোগান শুরু হয়। সঙ্গে ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি। অশান্তি এড়াতে পুলিশ, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে দোষী ঠাওরে মমতা সভা ছেড়ে চলে যান।

শনিবার সকালে চক্রবেড়িয়ায় গিয়ে দেখা গেল, সেই মঞ্চ নতুন করে বাঁধা হচ্ছে। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল নেতা মলয় দাস তদারক করছেন। বিজেপির ‘অসভ্যতার’ নিন্দে করে তিনি বললেন, ‘দিদি আজ এখান থেকেই পদযাত্রা শুরু করবেন। কাল ওই মাইক আমরা খুলে দিতে পারতাম। কিন্তু দিদি করতে দেননি। বারবার বলেছেন, ওদের নোংরামির সঙ্গে আমরা পাল্লা দেব না।’

ভবানীপুর যেন মিনি ভারত। বাঙালি হিন্দু এখানে কার্যত সংখ্যালঘু। অবাঙালি হিন্দুদের মধ্যে বেশি প্রাধান্য গুজরাটিদের। তাঁরা তো বটেই, মারোয়াড়ি, বিহারি এবং হিন্দু পাঞ্জাবিদের মধ্যেও ‘মোদি–প্রেম’ গদগদ। কয়েক দিন আগে খবর হয়েছে, বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো হচ্ছে দীনেশ ত্রিবেদীকে। ভোট মিটলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।

কেন দীনেশ, সে ব্যাখ্যাও সরকারি মহল থেকে নানাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রথম কারণ, তিনি গুজরাটি। দ্বিতীয় কারণ, তিনি চমৎকার বাংলা বলেন ও বোঝেন। তৃতীয় কারণ, পশ্চিমবঙ্গ তাঁর নিবাস এবং মমতার দৌলতে রাজনীতিতে আসা, যদিও পরবর্তী সময়ে দলত্যাগ ও বিজেপিতে যোগদান।

তবে এসব নয়, সবচেয়ে বড় কারণ নাকি ভবানীপুরের গুজরাটি মন জেতার চেষ্টা। ৪০ হাজার গুজরাটি ভোট বিজেপির ঝুলিতে ছেঁকে তুলে মমতাকে অপদস্থ করতেই নাকি প্রধানমন্ত্রী মোদি ওই দীনেশ নামের দ্বিতীয় তুরুপের তাসটি খেলেছেন। তাঁর প্রথম চাল শুভেন্দুকে প্রার্থী বাছা, মমতার বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে টক্কর দিতে যিনি অদ্বিতীয়।

গুজরাটি মন যে টালমাটাল, দিনভর ভবানীপুর ঘুরলে তা বেশ বোঝা যায়। বাজারগুলোয় ঝলমল করছে গুজরাটিদের দোকান। মিঠাই, ধোকলা, খান্ডবি, হরেক কিসিমের আচার ও বেসনের নানা রকমের গাঁটিয়া কিনতে আসা গুজরাটি নারী–পুরুষ ভণিতা না করেই বলছেন, মোদি এলে ব্যবসা–বাণিজ্যের উন্নতি হবে।

আশ্চর্যের কথা, এই বিশ্বাস, এই যে ব্যবসাপত্রের পরিবেশ আরও ভালো হবে বলে প্রচার, সংক্রামক অসুখের মতো গুজরাটি মহল পেরিয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছে মারোয়ারি, পাঞ্জাবিদের মধ্যে। এমনকি বিহারিদেরও দেখছি ‘বদলাওয়ের’ পক্ষে কথা বলতে। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত শিখ সম্প্রদায়।

একটা সময় ভবানীপুর ছিল শিখদের ডেরা। বছর কয়েক আগেও এখানে ৪০ হাজারের মতো শিখ ছিলেন। পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন তাঁরা। একটা সময় ছিল, যখন কলকাতার ট্রাক ও ট্যাক্সিচালকদের সিংহভাগ ছিলেন সরদারজিরা। স্পেয়ার পার্টসের ব্যবসায় ছিল তাঁদের একচেটিয়া অধিকার। নানা কারণে শিখ ভোটারের সংখ্যা কমেছে। তবে ‘দিদির’ প্রতি ভালোবাসা কমেনি। এই সম্প্রদায় এখনো মমতার প্রতি সহানুভূতিশীল।

হিন্দু উচ্চবর্ণ বাঙালি সমাজের যাঁরা কিছুদিন আগেও মমতাকে চোখে হারাতেন, উপনির্বাচনে দুহাত ঢেলে ভোট দিয়েছিলেন, সেখানেও কিছুটা ভাটার টান। শিক্ষা দুর্নীতি, তৃণমূল নেতাদের বাড়ি থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা উদ্ধার, আর জি করের অভয়া–কাণ্ড নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার ছায়া ফেলেছে এবারের ভোটে। এসব তাঁর চিন্তার কারণ হয়ে থাকলে স্বস্তির বিষয় অবশ্যই তাঁর লড়াকু চরিত্র।

এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের ছলচাতুরীর বিরুদ্ধে মাঠে নেমে মমতার প্রতিবাদ, ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপ্যানসির’ নামে হয়রান সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ ও মামলা করা তাঁকে অন্য এক উচ্চতা দিয়েছে। ‘ঘরের মেয়ে’ পরিচয় উজ্জ্বলতর করেছে। প্রবল তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করে রাস্তার দুধারে অপেক্ষায় থাকা মানুষের ভিড়, তাঁকে দেখতে, তাঁর ছোঁয়া পেতে মানুষের আকুতি বোঝায়, তাঁর প্রতি আস্থা ও ভরসা এখনো অটুট।

এর চেয়েও বড় অর্জন মুসলিম জনতার সমর্থন। ভবানীপুরের যে অংশ মুসলিম–অধ্যুষিত, খিদিরপুর লাগোয়া একবালপুর, যেখানকার প্রতিনিধি কলকাতা পৌরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিম—‘দিদি’কে জেতাতে কোমর বেঁধে নেমেছেন। বাদ যাওয়া ৫১ হাজার ভোটারের অধিকাংশ এই সম্প্রদায়ের।

নির্বাচনী প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের ভবানীপুর আসনে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। তিনি মমতাকে দুবাইয়ের টিকিট কেটে রাখার হুমকি দিয়ে রেখেছেন। ১৫ এপ্রিল ২০২৬, কলকাতা

চক্রবেড়িয়া, যদুবাবুর বাজার, হরিশ চ্যাটার্জি রোডের আশপাশের অবাঙালি হিন্দু ওয়ার্ডগুলো, দুই বছর আগে লোকসভা ভোটের সময় যারা তৃণমূল কংগ্রেস থেকে মুখ ফিরিয়ে ছিল, এবারও তারা জোড়াফুল ছেড়ে পদ্মফুলে ছাপ দেবে বলে শুভেন্দু নিশ্চিত। তেমনই নিশ্চিত একবালপুর, চেতলার জনতা।

গতকাল রোববার দুপুরে ফ্যান্সি মার্কেটের ব্যাপারীরা বললেন, ‘দিদি’কে তাঁরা বলেছেন, এখানে সময় নষ্ট না করে তিনি যেন অন্যত্র যান। পারফিউম বিক্রেতা ইকবাল আহমেদের কথায়, ‘মোদির মতো আমরাও গ্যারান্টি দিয়েছি, এখানকার ১০০ শতাংশ ভোট দিদিরই।’ ৭৭ ও ৮২ নম্বর ওয়ার্ড যে লিড তৃণমূলকে দেবে, ৬৩, ৭০, ৭৩, ৭৪ ওয়ার্ডের ঘাটতি তাতে মিটে যাবে।

মমতা আত্মবিশ্বাসী, অথচ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খচখচ করছে সংশয়ে। বিজেপি প্রত্যয়ী। জয়ের গন্ধ তারা পেতে শুরু করেছে। দিদির উদ্দেশে শুভেন্দুর হুংকার, ‘৪ মে দুবাইয়ের টিকিট কেটে রাখুন।’ এত জায়গা থাকতে কেন দুবাই? তৃণমূল কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক বাংলায় এ প্রশ্নের উত্তর চাওয়া আজ বাতুলতা।

Read full story at source