দিদিকে ছেড়ে কি মোদিতে ভরসা করতে চাইছেন কুপার্স ক্যাম্পের ছবিরানিরা

· Prothom Alo

ছবিরানি হালদারের আকুতি চোখে জল এনে দিল। বয়স নব্বই পেরিয়েছে। মেয়ের হাত ধরে ঠুকঠুক করতে করতে কাঁপা কাঁপা পায়ে যেখান থেকে বেরিয়ে এলেন, সেটাকে ঘর বলা যায় না। একটা সময় এই আস্তানা ছিল গোরা সেনাদের ছাউনি। টিনের চাদরে মোড়া লোহার অর্ধচন্দ্রাকার কাঠামোগুলো ছিল সেনা গুদাম।

অনেক কাঠামো ভেঙে গেলেও কিছু কিছু এখনো রয়ে গেছে। তার মধ্যেই ইট–কাঠ–মাটি লেপা আবাস, আলো–বাতাস যার চৌকাঠে গিয়ে দ্বিধাভরে থমকে দাঁড়ায়। শেওলা পড়া উঠানের একধারে রাখা কুড়িয়ে আনা শুকনা কাঠ–কঞ্চি–ঘুঁটে। গরিবের রান্নার রসদ। দরিদ্রদের জন্য মোদি সরকারের দেওয়া রান্নার গ্যাস ‘উজ্জ্বলা’ প্রকল্প ছবিরানিদের কাছে স্বপ্ন–কাহিনি। তাঁর চাহিদার তালিকায় দানের টাকা কিংবা চাল–ডালের রেশন বৃদ্ধি কোনোটাই নেই।

Visit betsport.cv for more information.

ছলছলে অসহায় চোখে তাকিয়ে জোড়হাতে ছবিরানির মিনতি, ‘ও বাবা, বাবা রে, সরকারকে বলে এই বসতটুকু শুধু লিখিয়ে দাও। এই ঘরটুকুর জমির পাট্টা পাইয়ে দাও। আর কিছু চাইনে।’

দেশভাগের পর দলে দলে চলে আসা ছিন্নমূল শরণার্থীদের যাঁরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার রানাঘাটে চলে এসেছিলেন, এই কুপার্স ক্যাম্প হয়ে উঠেছিল তাঁদের ঠিকানা। গোরা সেনাদের ছাউনি ও গুদামঘরগুলোতে ঠাঁই পাওয়া এবং ক্রমাগত সরকারি অবহেলা ছাড়া আজও অনেকের কিছুই জোটেনি। না নাগরিক পরিষেবা, না স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা। সম্বল এখনো শুধু সরকারি রেশন ও সামান্য কিছু অর্থ সাহায্য। ছবিরানিদের মতো অনেকেই এখনো সেই ‘ডোল’–এ বাঁচছেন।

‘আম্মা, কত টাকা ডোল দেয় গো সরকার?’ হাতের দুই আঙুল তুললেন নবতিপর ছবিরানি। ‘মাসে দুহাজার টাকা। আর দেয় রেশন। ৬ কেজি চাল, ৮ কেজি গম, দেড় কেজি মসুর ডাল।’

ছবিরানির কন্যা পূর্ণিমা ঘর থেকে মায়ের রেশন কার্ড নিয়ে এলেন। ভারত সরকারের উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দপ্তরের দেওয়া সেই রেশন কার্ডে তাঁর নাম ও নম্বর ছাড়া বাকি আঁকিবুঁকি পড়া দায়। অনেক কষ্টে উদ্ধার করা গেল একটা তারিখ। ১৯৫২ সালের অক্টোবর। ‘কোথায় বাড়ি ছিল গো আম্মা?’

রেশন কার্ডখানা বুকে আঁকড়ে ধরলেন ছবিরানি। যেন এই তাঁর শেষ সম্পত্তি। শেষ পারানির কড়ি। স্মৃতি ঝাপসা হলেও অমলিন। প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসার ছবি এখনো টাটকা। কতই বা বয়স তখন। পনেরো–ষোলো হবে। লাখখানেক মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল কুপার্স ক্যাম্পের এই গুমটিগুলো। কেন্দ্র ও রাজ্যের চরম অবহেলা ও উদাসীনতায় উদ্বাস্তু–আবাস কুপার্স ক্যাম্প ক্রমেই হয়ে উঠেছিল ‘বাংলার চম্বল’। ‘উপায়ও তো ছিল না। কী করবে লোকেরা? পেট চালানো যে বড় দায়।’

একটু দম নিয়ে ছবিরানি বললেন, ‘বরিশালে বাড়ি ছিল গো আমাদের। বরিশাল জেলার কাউখালির রঘুনাথপুর গ্রাম। তখন অভাব কী জানতাম না। এখানে আসার পর থেকে অভাব নিত্যসঙ্গী।’

বৃদ্ধা ছবিরানির রেশন কার্ড দেখাচ্ছেন মেয়ে পূর্ণিমা

নিত্য চুরি–চামারি, খুন–জখম, বোমাবাজির কুপার্সের ভোল এখন অনেক বদলেছে। উদ্বাস্তু শিবিরের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে এখন তা ১২ ওয়ার্ডের ‘নোটিফায়েড এরিয়া’। এখন ভোটার ১৭ হাজার। মতুয়া জনতা নয় নয় করেও হাজার তিনেক। নাগরিকত্ব এখনো তাঁদের মরীচিকার মতো হাতছানি দিয়ে দূরে সরে যায়। কে জানে এখনো কত পথ বাকি। নাগরিক না হলে রাজাই বা তারা হবে কী করে? কী করেই বা সত্য হবে গুরুচাঁদ ঠাকুরের সেই বাণী, ‘যে জাতির রাজা নেই/সে জাতি তাজা নয়’।

কুপার্স ক্যাম্প থেকে সংগঠিত হয়েছিল কমিউনিস্টরা। তখন টক্কর ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে। এখন বিজেপির পদ্মার মোকাবিলায় তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়া ঘাসফুল। ছবিরানিদের জীবনের বারমাস্যা যদিও অপরিবর্তিত। ছবিরানির গুমটিঘরের ওধারে গৌরাঙ্গ ব্যাপারীর চালা। তিনিও বাঁচেন সরকারি ‘ডোলে’।

টিনের ফুটো বেয়ে নেমে আসা সূর্যের আলোয় মাটির উনুনের ধোঁয়া মিশে তৈরি মায়াজালে আবছা দৃশ্যমান গৌরাঙ্গর বৃদ্ধা স্ত্রী। কাঠের বেড়ার সীমানার ওধারে পাকা ঘরের দেয়ালে সগর্ব ঘোষণা, ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা’।

কবে কোন মাসে কেন্দ্রের কত টাকায় ওই পাকা ঘর তৈরি, সেই হিসাব দেয়ালে সাঁটানো। ১০০ দিনের কাজের মতো এ রাজ্যে ওই যোজনাও এখন বন্ধ। গৌরাঙ্গ–ছবিরানিরা জুলুজুলু চোখে সেদিকে তাকিয়ে ভাগ্যকে দোষেন। হয়তো ভাবেন, খরচের হিসাব দিতে কী এত আপত্তি? হিসাব না দেওয়ায় কাজ বন্ধে ক্ষতি তো গরিবের?

‘মমতা দিদিরও তো অনেক প্রকল্প রয়েছে? কিছু পান না আম্মা?’ ছবিরানি দুদিকে ঘাড় নাড়েন। ‘কন্যাশ্রী’র বয়স গেছে। বিধবা বা বার্ধক্য ভাতার শিকে ছেঁড়েনি। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা বলেন, ‘দলের লোক না হলে, তোষামোদ না শিখলে পাওয়া কঠিন। আমারটা আমি বুঝে নিই নিজের মতো করে। দয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু জমির পাট্টাটুকু তো আমাদের হক? নব্বইটা বছর কি অল্প সময়? পনেরোটা বছরও তো কম নয়? পাট্টা দিতে পারতেন না মমতা?’

কঠিন ও জটিল প্রশ্ন। তৃণমূলের দিলীপ দাস, পিন্টু দত্তরা বুঝিয়ে চলেছেন, কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া এই জমির পাট্টা দেওয়ার ক্ষমতা দিদির নেই। তবে দিদিকে জেতালে তিনি চাপ সৃষ্টি করবেন। কুপার্স মানতে নারাজ। ১২ ওয়ার্ডের ১০টিই বিজেপির। তৃণমূল এখানে এখনো সংখ্যালঘু।

কুপার্সের জায়গায় জায়গায় পাকা ঘর। পরিচ্ছন্ন বাড়িও কিছু মাথা তুলে রয়েছে সদর্পে বৈভব ঘোষণার মতো। বাহুবল ও দলীয় শক্তির পরিচয় জাহির করছে। ওসব ছবিরানিদের কম্ম নয়। সার সত্য বুঝে গেছেন তাঁরা। ‘দিদির ওপর আর ভরসা করি না। পনেরোটা বছর আশায় আশায় কেটে গেল। এবার বদলাক!’

দিল্লি না বললে কিছুই যখন হবে না তখন দিদিকে ছেড়ে দিল্লির দিকেই তাকানোর ফাটকা কি খেলতে চাইছেন ছবিরানিরা? নিভে যাওয়ার আগে শেষ চেষ্টা? নদীয়া জেলার মোট ১৭ আসনের ৯টি গতবার বিজেপি জিতেছিল। এবার তা বাড়াতে বাংলায় মাটি কামড়ে পড়ে আছেন মোদি–শাহ। ছবিরানিদের শেষ ভরসা। আগামী ২৯ এপ্রিল রাজ্যের দ্বিতীয় দফা ভোটে ছবিরানিরা বিজেপির মোদি–শাহকে বেছে নেবেন কি না, এখন সেটাই দেখার।

Read full story at source