ডিজেল কার্ড কেন খাদ্যনিরাপত্তার সমাধান 

· Prothom Alo

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অভিঘাতে বিশ্বের উত্তাল তেলবাজারের ঢেউ এখন বাংলাদেশের কৃষকের বোরো খেতে এসে পড়েছে। এপ্রিলের এই প্রচণ্ড খরা ও গরমে দিনরাত সেচযন্ত্রগুলো চালু রাখা দরকার। ১৬ লাখের অধিক সেচযন্ত্রের প্রায় ১৩ লাখই চলে ডিজেলে। লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুচ্চালিত পাম্পের সঙ্গে ইঞ্জিনও রাখতে হয়।

Visit solvita.blog for more information.

সেচপাম্পের মালিকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া দুষ্কর। এর মধ্যেই আবার অন্যান্য জ্বালানি তেলের সঙ্গে ডিজেলের দামও লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এর পেছনে যুক্তি যা–ই থাকুক না কেন, এই মুহূর্তে ডিজেল সরবরাহ–সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির ফলে চলমান বোরো উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরকারি হিসাবমতে, দেশে ৫৩ লাখ হেক্টর জমির অর্ধেকের বেশি সেচ হয় ১৪ লাখ শ্যালো মেশিনে এবং এক–চতুর্থাংশ দুই লাখ লো লিফট পাম্প দিয়ে। শ্যালো মেশিনের তিন–চতুর্থাংশ এবং লো লিফট পাম্পের বেশির ভাগ চলে ডিজেল দিয়ে। অন্যভাবে বললে, দেশের মোট সেচের আওতাধীন জমির প্রায় ৬০ শতাংশ সেচ হয় ডিজেল দিয়ে। 

‘সোনার দামের ডলারে’ কিনে আনা তেল যাচ্ছে কোথায়?

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ডিজেলের গুরুত্ব কতটা, তা সহজেই বোঝা যায়। দুটি ক্ষেত্রে এটি খুবই প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, হাওরের নিম্নাংশের বোরো ধান পরিপক্বতার পর্যায়ে বিধায় সেচের প্রয়োজনীয়তা অতটা হয়তো নেই। তবু যেসব এলাকায় নামিতে বোরো লাগানো হয়েছে, সেখানে ধান এখন পুষ্টতা বা গ্রেইন ফিলিং পর্যায়ে। একটু ওপরের দিকের হাওর এলাকায় ধানের থোড় বের হয়ে পুষ্টতার দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সময়টা এখন খুব স্পর্শকাতর। সারা দেশে সেচের প্রয়োজন পুরো মে মাস চলবে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে সেচের সময় আরও বাড়তে পারে। কাজেই ডিজেল নিয়ে কৃষকের অস্বস্তি থাকছেই। 

প্রথমত, লিটারে ১৫ টাকা করে মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষিতে ব্যবহৃত প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টন ডিজেল বাবদ কৃষকের পকেট থেকে বাড়তি প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বের হয়ে যাবে। এটি কৃষকের বড় বিনিয়োগ ধাক্কা। প্রতিটি সেচপাম্পের মালিককে আগামী এক মাসে সেচযন্ত্র চালনা বাবদ তিন থেকে চার হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হবে। তাঁরা কৃষকদের কাছে পুরো সেচ মৌসুম সেচপানি সরবরাহ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। ব্যর্থ হলে আস্থার সংকট তৈরি হবে।

দ্বিতীয়ত, ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, দিন শেষে কম তেল পাওয়া বা না পাওয়া। এতে ব্যয়বহুল বোরো আবাদে কৃষকের উৎসাহে ভাটা পড়বে; কারণ, ধানের দামে খরচ ওঠে না। এ ছাড়া খরার সময় সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম হতে পারে।

তৃতীয়ত, সেচপাম্পের মালিকেরা প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে সেচপানির জন্য নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি ফি চাইতে পারেন। তাতে বোরো আবাদের খরচ এমনিতেই বেশি, এরপর সেচ বাবদ বাড়তি খরচ হলে কৃষকের আয় আগের চেয়ে কমে যাবে। এটিও টেকসই কৃষি আবাদের জন্য বড় ধাক্কা। 

চতুর্থত, সেচসংকটের কারণে এবার ফলন কম হতে পারে। সময়মতো পানি না পাওয়ার কারণে কৃষক অন্যান্য উপকরণ যেমন সার, ওষুধ, নিড়ানি ইত্যাদি প্রয়োগেও আগ্রহ হারাবেন। এর ফলে এবার নিম্ন ফলনের কারণে বোরো উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য চিন্তার বিষয়। 

তেলের মূল্যবৃদ্ধি: নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কথা ভাবছে কি সরকার

দ্বিতীয়ত, ডিজেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, দিন শেষে কম তেল পাওয়া বা না পাওয়া। এতে ব্যয়বহুল বোরো আবাদে কৃষকের উৎসাহে ভাটা পড়বে; কারণ, ধানের দামে খরচ ওঠে না। এ ছাড়া খরার সময় সেচ, সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কম হতে পারে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে করণীয় কী, তা ভাবনার বিষয়। কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথমত, পৌনে দুই কোটি কৃষকের সবার জন্য ডিজেল নয়, সেচের ডিজেল সরবরাহ করতে হবে কেবল ১৬ লাখ পাম্পমালিকের জন্য। তাঁদের তালিকা বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কাছে আছে। তাঁদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল কার্ড চালু করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান বোরো ধানের আবাদ রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে একেবারে অপরিহার্য নয়—এমন সরকারি পরিবহন খাত থেকে আগামী এক মাস অর্থাৎ মে মাস পর্যন্ত কিছু ডিজেল স্থানান্তরিত করে কৃষকদের কাছাকাছি পাম্পগুলোয় সরবরাহ বাড়ানো যায়। তৃতীয়ত, এর জন্য শক্ত তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থাও থাকতে হবে, যাতে উদ্দিষ্ট পাম্পমালিকের কাছে জরুরি ডিজেল পৌঁছায়।

এসব করতে করতে হয়তো বোরো মৌসুম চলে যাবে। কিন্তু এক মাঘে শীত যায় না। কৃষকের ডিজেলসংকট উত্তরণে এখন থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী আমন মৌসুমে একই সমস্যায় পড়তে হতে পারে।

এম এ সাত্তার মণ্ডল কৃষি অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

Read full story at source