অন্ধ যখন দেখে
· Prothom Alo

খুব প্রত্যয় নিয়ে ইরাম ‘ঊষার রশ্মি’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদককে নিজের লেখা প্রথম গল্পটি দিল। সম্পাদক বললেন ‘আপনিই পড়ে শোনান, পছন্দ হলে এখনই জানিয়ে দেব।’
Visit umafrika.club for more information.
সামান্য ইতস্তত করে ইরাম বলল, ‘কাহিনিগুলো বাস্তব থেকে নেওয়া’।
‘পড়ুন দেখি আগে’
ইরাম উৎসাহ পেয়ে পড়তে শুরু করল।
সাহিত্য সম্পাদক ও পাশে বসা তাঁর দুই আঁতেল বন্ধু গল্প শুনতে মন দিলেন।
ওরা গল্প করছিল। তিন মেয়ে বা তিন নারী। তিনজন ঠিক সমবয়সী না হলেও সমমনা। দুজন চাকরি করে। আরেকজন সদ্য চাকরি পেয়েছে, তবে যোগ দেয়নি এখনো। কর্মরত দুজন দুপুরের খাবারের পরই নানা অছিলা বা ছুতা দেখিয়ে আধা বেলার ছুটি নিয়েছে। উদ্দেশ্য, নতুন কর্মপ্রাপ্তাকে সলাপরামর্শ দেওয়া আর গল্প করা। পার্কের সবুজ ঘাসে বা ক্যাফেতে নয়, ছয়তলার ব্যালকনিতে পরামর্শ সভা ও আড্ডা। নানা বিষয়ে আলাপ জমে উঠেছিল। রান্নাবান্না, ফ্যাশন, ঘর সাজানো বা কেতামাফিক বলা যায়, গৃহশৈলীও ছিল আলোচনার বিষয়।
ওদের গল্প ও হাসির টুকরাটাকরা শাশুড়ির ঘরেও ছিটকে এসে পড়ছিল। মনে হলো, ওদের গলা হঠাৎ যেন খাদে নেমে গেছে। শাশুড়ি ভাবলেন, কী এমন কথা ওরা বলছে, যা তাঁকে ওরা শুনতে দিতে চায় না। তিনি কান পাতলেন। তিনজনের একজন তাঁর নিজের মেয়ে। সুতরাং তাঁর কোনো খুঁত নিয়ে যে হাসাহাসি হচ্ছে না, সে ব্যাপারে উনি নিশ্চিত।
খুঁত, হ্যাঁ, খুঁত নিয়ে হাসাহাসি করাকে উনি একেবারেই সহ্য করতে পারেন না, সত্যিকার অর্থে হাসাহাসি করাকে ভয় পান। জগতে কোনো মানুষই নিখুঁত হয় না। যে অন্যের খুঁত নিয়ে হাসে, তার ভাগ্যে খুঁতওয়ালা জিনিসই জোটে। তাঁর ছোটবেলায় একটি মেয়ে অন্য একটি চশমা পরা মেয়েকে চারচোখা বলে খেপাত। আশ্চর্য কাণ্ড! পরে ওই মেয়ের নিজের সন্তানের তিন বছর বয়স থেকে চশমা লেগেছে। আর সেই বাচ্চাকেও অন্য শিশুরা চশমাচোখা বলে খেপায়। নিজের সন্তানের চোখে চশমা দেওয়ার পর সেই মেয়ে অনুশোচনা করে বলেছিল, একদিন না বুঝে ওই ছোট্ট মেয়েকে চশমা চোখে দেওয়ার কারণে টিপ্পনী কেটে কষ্ট দিয়েছিল বলেই হয়তো আজ তার শিশুপুত্রের চোখেও চশমা। যে কষ্ট সে অন্যকে দিয়েছিল, সেই কষ্ট এখন তার বুকে শতগুণে বিঁধছে।
শাশুড়ি বিছানাঘেঁষা জানালার কাছে সরে এসে কান পাতলেন। তাঁর মেয়ে ছোট ভাইয়ের বউয়ের বড় চাকরি হওয়াতে দশজনের কাছে বড় মুখে বলছে। নানা বুদ্ধিও দিচ্ছে। ঘরের বাইরে মেয়েদের কী কী সমস্যায় পড়তে হয় আর সেসব সমস্যা কীভাবে মাথা খাটিয়ে বুদ্ধি দিয়ে মোকাবিলা করতে হয়, ওরা সেসব আলোচনা করছে। নিজেদের অভিজ্ঞতা ছাড়াও অন্যদের কাছে শুনে শেখা নানা ঘটনা কী সুন্দর করেই না বর্ণনা করছে ওরা, শিখছে, শেখাচ্ছে। এই যে অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি, এতে ওরা যে কতটা ঋদ্ধ হচ্ছে, তা ভেবে শাশুড়ি চমৎকৃত হলেন। এক বস বা পদস্থ ওপরওয়ালার হ্যাংলামো বন্ধের জন্য তার বউকে স্টাফ ফ্যামিলি ক্লাবের আহ্বায়ক বানানোর বুদ্ধিও বের করেছিল সংস্থার কর্মীরা। কারা যেন কোথায় কার্টুন তৈরি করে গোপন হেনস্তাকারীকে ঘাবড়ে দিয়েছিল। এ রকম অনেক ঘটনাই বলে চলছিল বাইরে-ঘরে দুই জগতেই ব্যস্ত মেয়ে দুটি। এর কোনোটা হাস্যকর, কোনোটা অপ্রীতিকর। এই সব গল্প ওরা সবাইকে বলবে না, বলবে একান্তে, নিজেদের মধ্যে। মেয়ে বলে বাইরের জগতে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয় বলেই ওরা বলছে। এত সমস্যার ভেতরেও নিজেদের নিরাপত্তার বেষ্টনী তৈরির কৌশলগুলো ওরা একে অন্যকে শোনাচ্ছে। শাশুড়ি স্বস্তি পেলেন, প্রীত হলেন। ভাবলেন, অফিস-আদালত বা রাস্তাঘাটে শুধু মেয়ে বলেই অপদস্ত হলে মেয়েরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে। অথচ ঘরের ভেতর যখন নিকট আত্মীয়ের অশালীন আচরণ মেয়েদের ভীত ও বিপর্যস্ত করে, তখন তো তারা সংসারের শান্তি ও সম্মানের কথা ভেবে চুপ থাকে। নীরব থেকে কৌশলে নিজেকে অবমাননা থেকে রক্ষাই করে চলে শুধু।
কথা শেষ করেই অন্ধ ফকির গলিতে নিমেষেই উধাও হলো। ইরাম ভয়ে বিহ্বল, হতভম্ব। তখনই একটা রিকশা গলিতে ঢুকল যেন ইরামকেই নিতে। দরদাম না করেই গন্তব্য বলেই রিকশায় উঠে পড়ল ও।
একজন বলল, ‘অফিস সময়ের পর যদি জরুরি কাজ সারার তাগিদে কখনো অফিসে থাকতে হয়, সহকর্মী বান্ধবীদের ভেতর কাউকে অনুরোধ করবে একটু অপেক্ষা করতে আর...’
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অন্যজন বলে উঠল, ‘কার এমন দায় পড়েছে যে ছুটির পরও সহকর্মীর স্বার্থে বসে থাকবে?’
‘নিজেদের ভেতর এমন বোঝাপড়া থাকবে যে সহকর্মী-বান্ধবীর প্রয়োজনে তোমাকেও ওই ত্যাগটুকু স্বীকার করতে হবে।’
‘আমি কী করি, জানো?’
বাকি দুজন একসঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘কী করো, বলো তো।’
‘আমার অধীনস্থ মেয়েদের একজনকে মামুলি কোনো কাজ দিয়ে বসিয়ে রাখি। পরে ওই কাজের জন্য ওকে ওভারটাইম বিল দিয়ে দিই। তবে তোমার বুদ্ধিও চমৎকার। এ রকম সামাজিক সম্পর্কজাল তৈরি করেও নিরাপদ থাকা যায়।’
‘আচ্ছা, মেয়েদের কেন বাইরে কাজ করতে গিয়ে এত কিছু ভেবেচিন্তে এগোতে হয় বলো তো? কোনো ছেলে যদি অফিস ছুটির পরও ফাইলে মুখ গুঁজে বসে থাকে, তখন বলা হবে, সাংঘাতিক কাজপাগল লোক আর মেয়ের ক্ষেত্রে বলা হবে, প্রমোশনের আশায় জান দিয়ে খাটছে...’
অন্য মেয়েটি বলল, ‘একলা বসে অফিস আওয়ারের পর কাজ করতে হলে প্রমোশনের লোভে বললে তো শোভন শোনায়। তখন বলা হবে, কার মন ভোলানোর জন্য যেন মেয়েটি কাজ করার ভান করে যাচ্ছে!’
‘বাইরের চেয়ে ঘরটাই মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয় কি?’
কথাটা শুনেই শাশুড়ি চমকালেন। ভাবলেন, এখানে তাঁর কিছু বলার আছে। বলতেই হবে তাঁকে। গড়াতে গড়াতে বিছানার কিনারে এসে ঝটিতে উঠে বসলেন। পা টেনে টেনে আলমারির কাছে গেলেন। কষ্টে আলমারির দরজা খুলে কাপড়ের ভাঁজ থেকে মলিন খাতাটা হাতে নিলেন। এমন সুযোগে মেয়েদের কিছু বলা যায়। যে কথা দুজন ছাড়া কাউকে কোনো দিন বলেননি তিনি। তাঁর নিজের শাশুড়ি অবশ্য যখন ঘটনা ঘটেছিল, তখনই ব্যাপারটা আন্দাজ করে পরিশীলিত আভিজাত্য ভুলে চাপা রাগে হিসহিসিয়ে উঠে বলেছিলেন, ‘বেজন্মার স্বভাব ভালো না, আমি টের পেয়েছি আগেই। রাগী কাজের মেয়ে যখন অশোভনভাবে গায়ে হাত দিয়ে ঠাট্টার প্রতিবাদে চিলচিৎকার দিল, ওকে অনেক তোষামোদ আর ব্যাগলতা করে চুপ করিয়েছি। আমার মেয়ে জানার আগেই অনেক বকশিশ দিয়ে ওকে কাজ থেকে বিদায় করেছি। বউমা, আমার ছেলেকেও তুমি কিছুই বোলো না, কেমন! এই দয়াটা করো, মা!’
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
স্বামীকেও ওই কুৎসিত অভিজ্ঞতার কথা কোনো দিন বলেননি তিনি। শাশুড়ির অনুরোধ কান্নার মতো তাঁর কানে বাজত। ঘরের অনেক বিশ্রী অভিজ্ঞতা মেয়েরা ভয়ে ও লজ্জায় কাউকে বলে না। উনি তখন নতুন বউ। বলার মতো জায়গা কোনটা, জানতেন না। তবে শাশুড়ি তাঁকে আগলে আগলে রাখতেন নিজ আত্মীয়ের কদর্য ব্যবহার থেকে।
বহু বছর পর এক বান্ধবী তাঁকে বলে আরও অদ্ভুত এক ঘটনা। ঘটনাটা এমন আশ্চর্য, যাকে এক অলৌকিক উদ্ধার মনে হয়েছিল। বান্ধবীর তখন কিশোরীকাল। কাজের বুয়া আর সে বাসায়। এক বয়সী জ্ঞাতি ভাই এসেছে। বিবাহিত। দুই বাচ্চার বাবা সে। এসেই হাঁকডাক, খালা কই, খালা কই?
‘নিচতলার বাচ্চাটার অসুখ। মা দেখতে গেছেন।’ বলেই বারান্দার নকশাদার গ্রিলে থুতনি রেখে নিচে মাকে ডাকবে কি না ভাবল। আচমকা পেছন থেকে তাকে ঝাপটে ধরল কেউ। ‘মা’ বলে চিৎকার করেছেমাত্র, তখনই বারান্দার বইয়ের আলমারির ওপর থেকে পাশের বাড়ির বিড়ালটা ঝাঁপিয়ে পড়ল বান্ধবীর কাঁধে। বাঁধন খুলে গেল। মুক্তি পেল সে। বেঁচে গেল সে।
মাকে ডাকতে ডাকতে সিঁড়ির দিকে ছুটে গেল। মাকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এসে দেখে, সেই ভাই হাওয়া। পরে কথাটা মাকে বলতেই তাকে উল্টো বকাঝকা করা হয়েছিল। বয়সে বড় গুরুজন বা মুরব্বির নামে এমন কথা বলতে নেই বলে উপদেশও দিয়েছিল মা। ওই দিন বিড়ালটাই ছিল ওর জন্য বাঁচোয়া।
বান্ধবীর কথা শুনে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়েছিল। হৃদয়বতী শাশুড়ি অন্তত বুঝেছিলেন ওর হেনস্থা হওয়ার কথা।
স্বামীর বড় বোনের স্বামী মানে ননাসজামাই মেহমান। নতুন বউ চা নিয়ে গিয়েছিল। কাপটা টেবিলে রেখেছেমাত্র। হাতটা খামচে ধরল নেকড়েটা। টেবিলে বসা বাড়ির পোষা বিড়াল হাতের ওপর মারল ঝাঁপ, কাপ গেল উল্টে। গরম চা ছলকে সবটুকু পড়ল মেহমানের কোলে। পুড়েছিল শরীর। পুড়েছিল কি চরিত্রের কদর্যতা? সংসারের শান্তি বাঁচাতে বউটি আজীবন রইল নিশ্চুপ।
অলংকরণ: আরাফাত করিমঅলৌকিক বিড়াল নামে ঘটনা দুটো তাঁর খাতায় লিখিত আছে। খাতাটা হাতে নিয়ে উনি (যিনি ব্যালকনিতে বসা মেয়েদের একজনের মা এবং একজনের শাশুড়ি) দেয়াল ধরে পা হেঁচরাতে হেঁচরাতে এগোচ্ছেন। উনি নিরাপদ পরিধির বিড়ম্বনার খবর বাইরের মেয়েদের কাছে পৌঁছে দিতে চান। বড় কষ্টের এ যাত্রা! কত দূর? আর কত দূর যেতে হবে ভাঙা পা ও ভীরু মন নিয়ে তাঁকে?
সম্পাদকের চেহারায় ইস্পাতকাঠিন্য নেমে এল। এক বন্ধু বলে উঠলেন, ‘বাহ্, এই গল্প নারীবাদী তাত্ত্বিকদের কাজে লাগবে!’
সম্পাদক বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘শুনুন, আমি গল্পের কারবারি। গল্প বলুন, গল্প লিখুন সত্য ঘটনা কতই তো জানি, ফালতু সত্য জানার দরকার কী?’
অন্য বন্ধুটি বলল, ‘সম্পাদক বাবু, সত্য সব সময় ফালতু হয় না। নোবেল পুরস্কার পাওয়া এক বইয়ের মূল চরিত্র সান্টিয়াগো; বাস্তবে এমন একজন সত্যিই ছিল, জানো তো?’
‘কোন বই? লেখকের কী নাম?’ আরেক বন্ধু জানতে চাইল।
‘সম্পাদক সাহেব বলুক। সে জ্ঞানী মানুষ, তার জানা আছে নিশ্চয়ই।’
বন্ধুদের কথা এড়িয়ে গিয়ে সম্পাদক ইরামকে বলল, ‘আপনি যান এখন। পারলে নতুন গল্প, হ্যাঁ গল্পই লিখে আনবেন। সত্য নয়।’
কষ্ট চেপে ইরাম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে প্রশ্নকারীকে বলল, ‘বইটা হচ্ছে The Old Man and the Sea আর লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।’
‘বাহ্ বাহ্!’ বলে ইরামকে বাহ্বা দিল দুজনই। সম্পাদকের কঠিন চোখ আরও কঠিন হলো।
বাসায় ফিরে ইরাম চুপচাপ শুয়ে রইল। বিকেলে উঠে হাতমুখ ধুয়ে গল্প লেখা কাগজ কটি জ্যাকেটের পকেটে পুরে বাসা থেকে বের হলো। দুপুরে খায়নি, বিকেলেও চা না খেয়ে বের হচ্ছে বলে মা পেছন পেছন এসে অনুযোগ করলেন, গাড়ি নিয়ে বের হতে বললেন। সে শুনতে পেল বলে মনে হলো না। বিত্তশালী পাড়ার সুড়কি–সিমেন্টের স্লাব বসানো গলি পেরিয়ে অন্য পাড়ার ভেতর দিয়ে আশি ফুট রাস্তা ধরে রেললাইনে উঠল ইরাম। রেললাইনের কিনার দিয়ে হাঁটছিল আর ভাবছিল। সে রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে ভাবনায় ডুবে যেতে ভালোবাসে। যদিও ইরামের এই হাঁটার বিষয়টা তার মা একদম পছন্দ করেন না। ভাবতে ভাবতে ইরাম গন্তব্যে পৌঁছাল।
বিশাল বাড়ি। গেটের এক পাশে বাড়ি ঘিরে থাকা দেয়াল ঘেঁষে তিনটি ছোট দোকান, অন্য পাশে তিনটি বিশাল গাছ। দোকানের একটি ডালপুরির, একটি দরজির ও অন্যটি হোমিওপ্যাথি দাওয়াখানা। বাড়ির মালিক সরকারি কর্মকর্তা। তিনপুরুষের ভিটা এই বাড়ি তার আবেগ, চাকরি তার কর্তব্য, হোমিওপ্যাথি চর্চা আর গল্প শোনা হচ্ছে শখ। আবেগ-কর্তব্য-শখ নিয়ে বিভোর লোকটির একমাত্র সন্তান ঈষাণী। ইরামের বন্ধু সে। পরীক্ষা শেষ, তাই ঈষাণী বিকেলে দাওয়াখানায় বসে। ইরাম ঈষাণীকে আজকের ঘটনা বলবে বলেই এসেছে। এসেই দেখে, দোকানগুলোর সামনের চিলতে বারান্দায় এক অন্ধ ফকির বসা।
‘হেঁটে আসলি তুই? বাবার আজ আসতে দেরি হবে রে,’ বলল ঈষাণী।
‘রিকশা করেই ফিরব আমি।’ আশ্বস্ত করল ইরাম।
তারপর বলল, ‘তোর শখের পুরির দোকান আজ দেখি জমজমাট!’
‘আজ লক্ষ্মী এসেছে যে।’
ইরামের চোখে প্রশ্ন। ঈষাণীও চোখের ইঙ্গিতে অন্ধকে দেখিয়ে বলে, ‘যেদিনই এসে বসে, সেদিনই পুরি কিনতে অনেকে আসে।’
‘সত্যি!’
‘মিথ্যা বলে কী লাভ?’
ইরামের চোখে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝামাঝি একটা ছায়া খেলে গেল। বাবার দাওয়াখানার মতোই ঈষাণীর শখের সৃষ্টি এই পুরির দোকান। যদিও ঈষাণীর মা এই গলির সাবেকি বাড়ি, হোমিও দাওয়াখানা, পুরির দোকান নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত আর বিষণ্ন। স্বামীর বিরাট চাকরির সূত্রে আলিশান ঝকঝকে সরকারি বাড়িতে থাকার সুযোগ ছিল। তা হলো না।
তাদের বাগানের মালি ও তার বউকে দিয়ে ঈষাণী পুরির দোকান শুরু করিয়েছে। অর্থ জোগানো, খরচপাতির হিসাব দেখা, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা ঈষাণীর কাজ। মালির বউ ডাল ঝেড়ে–বেছে ধুয়েছে কি না, হাত ধুয়ে ময়দা মাখল কি না, সব খুঁটিয়ে দেখে ঈষাণী। মালি বিকেলে সাফসুতরা কাপড়জামা ও মাথায় বাবুর্চির টুপি পরে দোকানে চুলা জালায়। নিঃসন্তান মালি দম্পতি ঈষাণীর সঙ্গে এই মজার কাজে মহা উৎসাহে লেগে আছে। মানুষ ভালোবেসে শখের কাজ করলে তা ভালো না হয়ে যায় না। তবে বিকাল–বিদায় ও সন্ধ্যা আগমনের সন্ধিক্ষণ, রহস্যময় লক্ষ্মী অন্ধ ফকিরের উপস্থিতি, পুরির দোকানের উপচে পড়া ভিড় দেখে ইরামের ধাঁধা লাগছিল। হোমিওপ্যাথির জন্য লোকজন আসে দেরিতে। তারা জানে, ডাক্তার সাহেব অফিস করে চা-নাশতা খেয়ে তবেই দাওয়াখানায় আসেন।
ইরাম এই অবসরে ধীরে ধীরে আজকের দিনের অভিজ্ঞতা বলে যায়। সব শোনার পর ঈষাণী বলে, ‘গল্পটা পড়ে শোনা তো।’
ইরাম উৎসাহ নিয়ে গল্পটা পড়ে শোনাল। শুনে ঈষাণী মুগ্ধস্বরে বলে উঠল, ‘বাহ্ ভালো লিখেছিস। আরে, আমাদের কলেজের ইবাদ স্যারের কীর্তিটা লিখলি না কেন?’
‘আমি তো ঘরের ভেতরের গল্প বলছি শুধু। এটাও ছিঁড়ে ফেলব, পুড়িয়ে ফেলব।’ হতাশ গলায় বলল ইরাম।
ঈষাণী কী বলবে, ভেবে পেল না। আচমকা বলল, ‘চল, ডালপুরি খাই। রসুন-কাঁচা মরিচ দিয়ে তৈরি তেঁতুলের সস দিয়ে মাখিয়ে পুরি খেতে অপূর্ব!’
গরম গরম ডালপুরি তেঁতুলের টকঝাল চাটনি দিয়ে খেল ওরা। ইরাম ক্ষুধার্ত ছিল বলে ওর কাছে অমৃতের মতো লাগল খাবারটা। এ সময় পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে, অন্ধ ফকির উঠে দাঁড়িয়েছে। অবাক হলো দেখে যে তার হাতে ধরা ভিক্ষার থালায় একটি জ্বলন্ত মোমবাতি। জ্বলতে জ্বলতে ক্ষয় হওয়ার পথে প্রায়। ইরাম ঈষাণীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফকিরের পিছু নিল। শীতের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের ভুতুড়ে আলো। ইরাম অন্ধের পাশে পাশেই হাঁটছিল। অবাক হয়ে দেখল, ও যে গলিতে যাবে, সে গলিতেই ঢুকছে ফকির। সুনসান গলি। ইরাম আর অন্ধ ফকির। ইরাম তার জ্যাকেটের পকেট থেকে গল্প লেখা কাগজটা বের করে মোমবাতির আগুনে ধরল। হঠাৎ ভৌতিক কাণ্ডের মতো চাদরের ভেতর থেকে ফকিরের আরেকটা হাত বেরিয়ে এসে ছোঁ মেরে গল্পটা নিয়ে নিল। ইরাম ভয়ে খামোশ হয়ে রইল। এরপর তা ইরামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ফকির বলল, ‘কেউ একজন বোঝেনি বলে নিজের কষ্ট করে তৈরি জিনিস নষ্ট করবে, মা? এ কেমন কথা! একজন বুঝল না, তাতে কী? অন্য কেউ বুঝবে, আজ মর্যাদা দিল না, তো কী? আগামীকাল দেবে।’
কথা শেষ করেই অন্ধ ফকির গলিতে নিমেষেই উধাও হলো। ইরাম ভয়ে বিহ্বল, হতভম্ব। তখনই একটা রিকশা গলিতে ঢুকল যেন ইরামকেই নিতে। দরদাম না করেই গন্তব্য বলেই রিকশায় উঠে পড়ল ও। ভেবে কূল পেল না, অন্ধ ফকির মোমবাতি নিয়ে কেন চলে? অন্ধ কীভাবে দেখল যে সে কাগজটা পোড়াতে চাইছে? ফকিরের একটা কথা তার কানে অমোঘ সত্যের মতো ঝংকার তুলছে, ‘আজ মর্যাদা দিল না, তো কী? আগামীকাল দেবে।’