চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের পর দুই স্বজনকে পুলিশে সোপর্দ, পাল্টা অভিযোগে ইন্টার্নদের কর্মবিরতি

· Prothom Alo

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মায়ের মৃত্যুর পর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করতে গেলে এক সেনাসদস্য ও তাঁর ভাইকে পিটিয়ে পুলিশে দিয়েছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। এমন অভিযোগ তাঁদের স্বজনেরা করছেন। অন্যদিকে ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ‘মবের’ শিকার হওয়ার প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করেছেন। তাঁরা নিরাপত্তার দাবিতে আজ মঙ্গলবার সকালে মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছেন।

Visit sport-tr.bet for more information.

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাতে মারধরের শিকার সেনা সদস্যের নাম সোহেল আলী (২৯)। তাঁর পদ ল্যান্স কর্পোরাল। তাঁর ভাইয়ের নাম জয় আলী (২৪)। তারা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ধর্মহাটা গ্রামের আলম আলীর ছেলে। তাঁদের মা জুলিয়ারা বেগমকে (৫০) গত রোববার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান।

মায়ের মৃত্যুর পর সেনাসদস্য সোহেল আলী ও তাঁর ভাই জয় আলী ওয়ার্ডে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসকের কাছে যান। তাঁরা অভিযোগ করেন, চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে। সোহেল আলী এ সময় ভিডিও করছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অন্যান্য ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা এসে সোহেল আলীকে মারধর করেন। এতে সোহেলের মুখে জখম হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তাঁকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় আহত সোহেল আলীকে চিকিৎসাও দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ডেকে দুই ভাইকে হস্তান্তর করা হয়। এরপর রাত তিনটার দিকে তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার এস এম মোশাররফ হোসেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও একজনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মায়ের মৃত্যুর পর আসামিরা চিকিৎসা অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে চিৎকার শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক তানিয়া আক্তার ও শিবলীর সরকারি কাজে বাধা দিয়ে আক্রমণাত্মক ও মারমুখী হয়ে কথা–কাটাকাটিসহ বিভিন্ন প্রকার হুমকি প্রদর্শন করতে থাকেন। ল্যান্স কর্পোরাল সোহেল আলী তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোন দিয়ে ঘটনার ভিডিও ধারণ শুরু করেন। তখন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা ভিডিও ধারণ করতে বারণ করেন। কিন্তু জয় চিকিৎসকদের সরকারি কাজ ব্যাহত করে তাঁদের সঙ্গে চিৎকার–চেঁচামেচি করতে থাকেন ও মারমুখী আচরণ করেন। একপর্যায়ে অন্য ওয়ার্ড থেকে আরও অন্যান্য ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ উপস্থিত লোকজন তাদের আটক করে রাজপাড়া থানা-পুলিশকে খবর দেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, ততক্ষণে হাসপাতালের পরিচালকসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয় পক্ষের কাছ থেকে ঘটনা সম্পর্কে জানেন। পরিচালকের নির্দেশে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জেনে থানায় এসে বাদী এজাহার দায়ের করেন। বিবাদী সোহেল আলী ইন্টার্ন চিকিৎসক ও উপস্থিত লোকজনের কাছে আটকের সময় সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ আছে।

রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, রাতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জুলিয়ারা বেগমের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করা মামলায় জয় আলীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ সকালে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আর এই মামলা মূলে সামরিক আইনে বিচারের জন্য সেনাসদস্য সোহেল আলীকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার এজাহারে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঘটনা বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে ইন্টার্ন চিকিৎসক তানিয়া আক্তার ও মো. শিবলীর সঙ্গে মারমুখী আচরণ ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু আজ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ইন্টার্ন চিকিৎসক শিবলী প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ছিলেন না। তিনি ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের একই রকম একটি ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সেখানে চিকিৎসা অবহেলা হয়নি। রোগীর স্বজনদের গায়ে হাতে তোলা হয়নি। রোগীর স্বজনেরাই তাঁদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেছেন, চিৎকার–চেঁচামেচি করে সরকারি কাজে বাধা দিয়েছেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসক তানিয়া আক্তারের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি একটু পরে কথা বলতে চান বলে জানান।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মানববন্ধন। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে

হাসপাতালে আগের দিন রোববারও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত দুই ইন্টার্ন চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের উত্তপ্ত পরিস্থিতির তৈরি হয়। পরদিন গতকালও একই ঘটনা ঘটে। এই দুই দিন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হেনস্তা ও মবের শিকার হয়েছেন বলে আজ ইন্টার্ন ডক্টরস সোসাইটি বিষয়টি উল্লেখ করে এক নোটিশে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে সকাল ৯টা থেকে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচির পালন করেন।

আজ সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসক সোসাইটি, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশ নেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। তাঁরা জানান, গত ১৯ এপ্রিল রাতে হাসপাতালের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর এক স্বজনের হামলায় দুজন পুরুষ ইন্টার্ন চিকিৎসক আহত হন। একইভাবে ২০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসক হেনস্তা ও মবের শিকার হন। এসব ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে তাঁরা এ কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাঁদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে তাঁদের ডাকা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতি চলমান আছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের মুখপাত্র শংকরকে বিশ্বাস বলেন, এ বিষয়ে মিটিংয়ে আছেন, পরে কথা বলবেন।

Read full story at source