ন্যায়বিচারের স্বার্থে জামিন নিশ্চিত করুন

· Prothom Alo

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনায় হওয়া মামলায় সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাঁর দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই একই নীতি কি সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে? এর উত্তর হচ্ছে ‘না’। 

সম্প্রতি আরও একটি হত্যা মামলায় কারাবন্দী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে তাঁকে মোট ১২টি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। এভাবে একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বিষয়টি নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

Visit palladian.co.za for more information.

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু ব্যক্তি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে অপরাধে জড়িত থাকলেও বাস্তবতা হলো, বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢালাও ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার শিকার হয়েছেন। ফলে ন্যায়বিচারের স্বার্থেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আটক ব্যক্তিদের জামিন নিশ্চিত করা এবং মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পুনর্মূল্যায়ন।

বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় জামিন কোনো দয়া বা করুণা নয়; এটি একটি মৌলিক আইনি অধিকার। একজন ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের চোখে নির্দোষ। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোয় দেখা গেছে, অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি ছাড়াই অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। এতে শুধু ব্যক্তি নন, তাঁর পরিবার ও সামাজিক অবস্থানও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ঢালাও মামলার অন্যতম বড় সমস্যা হলো, এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকৃত অপরাধী বা সরাসরি গুলির নির্দেশদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্বল বা ভিত্তিহীন, তাঁরাই কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন। এই বাস্তবতা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে।

মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশের আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেটা ঘটেনি। এ রকম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার মামলাগুলো যাচাই–বাছাই করার কথা বলেছিল। বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার বিবেচনায় কাউকে কাউকে জামিনও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। এর ফলে আটককৃত ব্যক্তিরা জামিনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখন যাচাই–বাছাই করে দ্রুত তাঁদের জামিন দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। 

এখন যেহেতু নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, তাই জনগণের প্রত্যাশা—এই সমস্যার একটি ন্যায়সংগত সমাধান হবে। নতুন বাস্তবতায় প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে সমঝোতার রাজনীতির দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধিতেও মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। যাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরপরাধ মানুষকে আসামি করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এটি একদিকে যেমন ভবিষ্যতে এমন অপব্যবহার কমাবে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানসংক্রান্ত বেশ কিছু মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে এসে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া। সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে যাচাই–বাছাই ছাড়া কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। সময় এসেছে সেই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর।

ঢালাও মামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণভিত্তিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই হবে না; নিরপরাধ ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জামিনের বিষয়টি এখানে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। কারণ, এটি বিচারাধীন ব্যক্তিকে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয় এবং অযথা কারাবাসের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করে। সবশেষে বলা যায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও মানবিকতা দুটিই সমান জরুরি।

Read full story at source