বিপদ মোকাবিলায় ইবনুল জাওজির দর্শন
· Prothom Alo

একজন আলেম বা ধর্মপ্রচারক যখন জনমানসে পরিচিতি পান, তখন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষ যেমন তাঁর কথা ও কাজের মিল খোঁজে, বিরোধীরাও তেমনি তাঁর ভুল ধরার অপেক্ষায় থাকে।
তাই কোনো বিপদ বা পরীক্ষায় পড়লে একজন আলেমের সাধারণ মানুষের মতো ভেঙে পড়া সাজে না; বরং তাঁকে নবীদের আদর্শ আঁকড়ে ধরে ধৈর্য ও অবিচলতার উদাহরণ সৃষ্টি করতে হয়। ইবনুল জাওজি এখানেই অনন্য।
Visit lebandit.lat for more information.
নবীজির নির্দেশনা
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের ওপর বিপদের তীব্রতা নির্ভর করে তার দ্বীনের গভীরতার ওপর। রাসুল (সা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো—কাদের ওপর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে?
তিনি বললেন, ‘নবীদের ওপর, তারপর যারা তাদের পর্যায়ভুক্ত (নেককার) তাদের ওপর; মানুষকে তার ধর্মভীতি অনুযায়ী পরীক্ষা করা হয়, যদি কেউ ধর্মের পথে শক্ত থাকে তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৮)
ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)বিপদের সময় মুমিনের উচিত নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জিহ্বার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা, যেন কোনো অসংলগ্ন কথা বা অভিযোগ প্রকাশ না পায়।‘এই তো আল-আমিন, আমরা রাজি’ইতিহাসের পাতায় এমন কোনো বড় আলেম বা ইসলাম প্রচারক খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি সত্যের পথে চলতে গিয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হননি।
ইবনুল জাওজি (৫১১-৫৯৭ হি.) ছিলেন তাঁর সময়ের অনন্য ওয়ায়েজ ও লেখক, যার মজলিশে হাজারো মানুষ ইসলাম গ্রহণ করত। কিন্তু তাঁর জীবনেও ছিল একের পর এক মর্মান্তিক পরীক্ষা।
ইবনুল জাওজির জীবনের পরীক্ষাগুলো
১. পুস্তক হারানো: ৫৫৪ হিজরিতে বাগদাদের ভয়াবহ বন্যায় তাঁর বিশাল লাইব্রেরি ও বহু পাণ্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে যায়। একজন জ্ঞানপিপাসু লেখকের জন্য এটি ছিল সীমাহীন বেদনাদায়ক।
২. সন্তান শোক: একই বছর তাঁর মেধাবী ছেলে আবদুল আজিজ বিষপ্রয়োগে মারা যান।
৩. নির্বাসন: জীবনের শেষ প্রান্তে প্রায় ৮০ বছর বয়সে ঈর্ষাপরায়ণ শত্রুদের ষড়যন্ত্রে তাঁকে ‘ওয়াসিত’ নামক স্থানে নির্বাসিত করা হয় এবং সেখানে পাঁচ বছর তিনি নির্জন কারাগারে বন্দি ছিলেন।
৪. সন্তানের অবাধ্যতা: তাঁর বড় ছেলে আলী কেবল অবাধ্যই ছিল না, বরং বাবার দুর্দিনে তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলো পানির দরে বিক্রি করে দিয়েছিল। এই ছেলের সংশোধনের জন্যই তিনি তাঁর বিখ্যাত উপদেশনামা লাফাতুল কাবাদ ইলা নাসিহাতিল ওয়ালাদ রচনা করেছিলেন। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২২/৩৫৩)
ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ.)আসল মহাবিপদ হলো—যখন তোমাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও তাকওয়া অর্জনের মনমানসিকতা দেওয়া হয়, কিন্তু সঙ্গে এমন এক প্রবৃত্তি দেওয়া হয় যা কেবল নশ্বর সুখের দিকে ছোটে।ইবনে তুলুনের স্বাধীনতা, ইবনে জাওজির ঐতিহাসিক জানাজাইবনুল জাওজির ‘বিপদ দর্শন’
ইবনুল জাওজি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ সাইদুল খাতির-এ বিপদে ধৈর্য ধারণের কিছু অনন্য মূলনীতি তুলে ধরেছেন:
ইমানের কষ্টিপাথর: বিপদ হলো ইমানের প্রকৃত মাপকাঠি। প্রকৃত মুমিন তিনি, যিনি বিপদের তীব্রতায় বিচলিত না হয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ বৃদ্ধি করেন। তিনি সতর্ক করেছেন, ‘বিপদের সময় মুমিনের উচিত নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও জিহ্বার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা, যেন কোনো অসংলগ্ন কথা বা অভিযোগ প্রকাশ না পায়।’ ( পৃষ্ঠা: ৬৯)
হতাশা রোধের কৌশল: তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, বড় কোনো মুসিবত এলে তার চেয়েও বড় কোনো বিপদের কথা কল্পনা করা উচিত এবং এর বিনিময়ে আখেরাতের সওয়াবের কথা ভাবা উচিত। (পৃষ্ঠা: ২০৫)।
প্রকৃত বিপদ কোনটি: তাঁর মতে, পার্থিব ক্ষতিই আসল ক্ষতি নয়। তিনি বলেন, ‘আসল মহাবিপদ হলো—যখন তোমাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও তাকওয়া অর্জনের মনমানসিকতা দেওয়া হয়, কিন্তু সঙ্গে এমন এক প্রবৃত্তি দেওয়া হয় যা কেবল নশ্বর সুখের দিকে ছোটে।’ (পৃষ্ঠা: ২০৫)
বল হয়, ‘যে ব্যক্তি পাপ মাফের আশায় বিপদে আনন্দিত হতে পারে না, ফেরেশতারা তার সম্পর্কে বলে—আমরা তাকে ওষুধ দিয়েছিলাম কিন্তু সে সুস্থ হতে চাইল না।’
বিপদ মোকাবিলায় আলেমের কর্তব্য
বিপদ ও মুসিবতের সময় একজন আদর্শ আলেম এবং সাধারণ মানুষের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
মুহাম্মদ আল-গাজালি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘যারা নিজেদের জীবন আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করেছেন, আল্লাহর প্রতি তাঁদের অনুভূতি হতে হবে গভীরতর এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে আরও মজবুত; তাঁরা যদি উজ্জ্বল আলো থেকে বিচ্যুত হন, তবে বড়জোর তার পাশের ছায়াযুক্ত এলাকায় যেতে পারেন, কিন্তু অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া তাঁদের পদের সঙ্গে মানানসই নয়।’ (মা’আল্লাহ: দিরাসাত ফিদ দাওয়া ওয়াদ দুয়াত, পৃষ্ঠা: ১৫১)
বল হয়, ‘যে ব্যক্তি পাপ মাফের আশায় বিপদে আনন্দিত হতে পারে না, ফেরেশতারা তার সম্পর্কে বলে—আমরা তাকে ওষুধ দিয়েছিলাম কিন্তু সে সুস্থ হতে চাইল না।’
সা’দ ইবনে মুআজের রুমাল