অন্টারিওর জলে ভেসে ওঠা এক শহরের গল্প

· Prothom Alo

কানাডা নিয়ে কল্পনার কুয়াশা ভেঙে টরন্টো সফর হয়ে ওঠে অন্য রকম অভিজ্ঞতায় ভরা। গবেষণাপত্র উপস্থাপনার ফাঁকে প্রকৃতি, শহরের ছন্দ ভরিয়ে দিয়ে মন আর পুরোনো বন্ধুত্বের নবায়নে এই সফর হয়ে ওঠে স্মরণীয় এবং গভীর অনুভবে মাখামাখি।

কানাডা নামটা শুনলেই আমার মনে অনেক দিন ধরে এক অদ্ভুত দৃশ্যকল্প ভেসে উঠত। যেন অন্টারিও হ্রদের ওপর ধূসর কুয়াশায় ঢাকা এক হাড়কাঁপানো সকাল। সেই কুয়াশার চাদর ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে একটি ছোট নৌকা। চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা রাজহাঁসের দল। আর বাতাসে কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে রবীন্দ্রনাথের সেই গান—‘সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায়, বিদেশি নায়ে / তাহারি রাগিণী লাগিল গায়ে...॥’

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে লেখক

আমাদের অনেকের কাছেই কানাডা আর ঠান্ডা যেন প্রায় সমার্থক শব্দ। বাস্তবতাও খুব একটা ভিন্ন নয়। তবে গত জুন মাসে টরন্টোয় গিয়ে সে ধারণা খানিকটা ধাক্কা খেল। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আমার নতুন গবেষণাপত্র উপস্থাপন করতে গিয়েছিলাম। সেই সফর শুধু একাডেমিক অভিজ্ঞতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল প্রকৃতির কিছু বিস্ময়কর দৃশ্য আর ফিরিয়ে দিয়েছিল বহু পুরোনো বন্ধুত্বের স্মৃতি।

ভোরবেলা কেমব্রিজের পার্ক অ্যান্ড রাইড থেকে কোচে যাত্রা শুরু। ইংল্যান্ডের নরম আলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। যাত্রাপথের নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন লন্ডনের ব্যস্ততম হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে সকাল ১০টা। বিমানবন্দরের ভেতরই স্টারবাকসে দ্রুত নাশতা সেরে ঢুকে পড়লাম এয়ার কানাডার লাউঞ্জে। দুপুর ঠিক ১২টায় শুরু হলো পশ্চিমমুখী যাত্রা। সামনে বিস্তৃত শুধুই অতলান্তিক মহাসাগর; অসীম নীল জলরাশি। হিথরো থেকে টরন্টো প্রায় সাত ঘণ্টার পথ। এর মধ্যে প্রায় ছয় ঘণ্টাই কাটে আটলান্টিকের ওপর দিয়ে উড়ে।

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ স্টেশন

মাঝেমধ্যে কয়েকটি মাঝারি টারব্যুলেন্সের ধাক্কা পেরিয়ে অবশেষে আমাদের বিমান অবতরণ করে টরন্টো পিয়ারসন বিমানবন্দরে। স্থানীয় সময় তখন বেলা তিনটা। বিমানবন্দরে নেমে প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হলো প্রফেসর মার্সিয়ান খ্রিস্টিয়ার জন্য। তারপর একটা ক্যাব নিয়ে রওনা দিলাম সাউথ ভনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের দিকে। যাত্রাপথে বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আকাশের আলো তখনো নিভে যায়নি। আর যে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার কথা এত দিন শুনে এসেছি, তা খুব একটা টের পাচ্ছিলাম না, বরং ছিল প্রবল বাতাস। হোটেলের কাছেই একটি মধ্যপ্রাচ্যীয় রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার সেরে সোজা ঘুম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই চোখ যেন বিস্ময়ে কপালে উঠে গেল। চারপাশ ঝকঝক করছে ভোরের সোনালি রোদে। সেই সকরুণ বেণুর সুর কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে। বরং মনে হচ্ছিল যেন রবিশঙ্করের সেতারের মৃদু আলাপ বাজছে প্রকৃতির অর্কেস্ট্রায়। কনফারেন্সের প্রথম দিনের সেশন শুরু হবে বেলা একটায়। তাই সকালে সময় ছিল হাতে। নাশতা সেরে, একটি পানির বোতল আর টরন্টো শহরের মানচিত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ডাউনটাউনের দিকে। ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টেশন থেকে মেট্রো ধরে সোজা চলে এলাম শহরের প্রাণকেন্দ্র ইউনিয়ন স্টেশনে। বেলা যত বাড়ছিল, প্রকৃতির সুরও যেন বদলে যাচ্ছিল।

টরন্টোর ডাউনটাউনে

সকরুণ বেণুর সুর সেতার হয়ে, সেখান থেকে যেন একসময় বাংলার ঢোলের মতো তীব্র হয়ে উঠল। অর্থাৎ প্রচণ্ড গরম আর লু হাওয়া। যেকোনো নতুন শহরে গেলে আমার প্রথম আগ্রহ থাকে সেই শহরের প্রাচীন গির্জা বা ক্যাথেড্রাল সম্পর্কে জানার। কারণ, শহরের ইতিহাস প্রায়ই সেখানে লুকিয়ে থাকে। যেমন ব্রিস্টলের প্রাচীন ক্যাথেড্রালে দাঁড়িয়ে একসময় জেনেছিলাম আটলান্টিক দাস বাণিজ্যের গল্প। আবার রোমানিয়ার ক্লুজ নাপোকা শহরের সেন্ট মাইকেল গির্জায় শুনেছিলাম অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস।

টরন্টো শহর তুলনামূলক খুব পুরোনো নয়। তবু শহরের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ক্যাথেড্রাল, যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ১৭৯৭ সালে। শহরটি তুলনামূলক নতুন হলেও এর ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও বহুস্তরীয়। আধুনিক শহর হিসেবে টরন্টো প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৩৪ সালে, যখন ব্রিটিশরা ‘টাউন অব ইয়র্ক’ নামের বসতিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সিটি অব টরন্টো’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে মানুষের বসতি এখানে তারও বহু হাজার বছর আগে থেকেই। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমান টরন্টো অঞ্চলে অন্তত ১২ হাজার বছর ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল।

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ক্যাথেড্রাল

ওয়েনডাট, হাউডেনোসাউনি, আনিশনাবেগ ও মিসিসাগা জাতিগোষ্ঠীর মানুষ এ অঞ্চলে বসবাস করত এবং এখানকার নদী ও হ্রদকে ব্যবহার করত বাণিজ্য ও যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে। লেক অন্টারিওর তীরে অবস্থানের কারণে এই অঞ্চল খুব দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে পরিণত হয়। ইউরোপীয়রা আসার আগে থেকেই এখানে ছিল ‘টরন্টো ক্যারিয়িং প্লেস ট্রেইল’। এটি একটি প্রাচীন পথ, যা লেক অন্টারিও থেকে উত্তর দিকের গ্রেট লেকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের শর্টকাট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ১৭৫১ সালে ফরাসিরা এখানে একটি ছোট্ট বাণিজ্যকেন্দ্র ফোর্ট রুইয়ে নির্মাণ করেছিল, যা মূলত আদিবাসীদের সঙ্গে পশমের ব্যবসার জন্য ব্যবহৃত হতো। পরে সাত বছরের যুদ্ধে ব্রিটিশদের কাছে পরাজয়ের পর তারা এই দুর্গ পরিত্যাগ করে।

আজকের টরন্টো পৃথিবীর অন্যতম বহুজাতিক শহর। ১৫০টির বেশি ভাষা এখানে প্রচলিত এবং বিশ্বের অন্যতম বহুসাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে এটি পরিচিত। শহরটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ নগর অর্থনীতির কেন্দ্র এবং একই সঙ্গে শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। আরও মজার তথ্য হলো, টরন্টো নামটি আদতে এসেছে একটি আদিবাসী শব্দ ‘টকারন্টো’ থেকে, যার অর্থ ‘যেখানে পানির ভেতর খুঁটি দাঁড়িয়ে আছে’। ধারণা করা হয় যে স্থানীয় আদিবাসীরা মাছ ধরার জন্য হ্রদের পানিতে কাঠের খুঁটি বসিয়ে ফাঁদ তৈরি করতেন। সেখান থেকেই নামটির উৎপত্তি।

লেক ওন্টারিওটরন্টোর বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক সিএন টাওয়ার

সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ক্যাথেড্রাল থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম টরন্টোর বিখ্যাত ল্যান্ডমার্ক সিএন টাওয়ারে। ১৯৭৩ সাল থেকে অন্টারিও হ্রদের কুল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এই টাওয়ার যেন শহরটির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এর একটু দূরেই বিস্তৃত সেই বিশাল লেক অন্টারিও।

দুপুরের ঝকঝকে রোদ, মিষ্টি নীল জলের ওপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাস আর একধরনের নীরব শান্ত পরিবেশ—সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত মোহনীয় আবহ তৈরি করেছে হ্রদের তীরজুড়ে। চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। বাতাসের স্পর্শ, দূরের পাখিদের ডাক, আর সেই নীরবতা—সবকিছু ধীরে ধীরে মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিচ্ছিল। ঠিক সে সময়ই বেরসিক ক্ষুধা বেচারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

দুপুরের খাবারে ঝিল ওমলেট, চৌকো করে কাটা আলুভাজা, ব্রাউন ব্রেড আর সালাদ

অগত্যা ধীরে ধীরে হারবারের দিকে এগোলাম। একটি সুন্দর গোছানো ক্যাফে চোখে পড়তেই বারান্দার সামনে রাখা টেবিল-চেয়ারে বসে পড়লাম। দুপুরের খাবার অমলেট, চৌকো করে কাটা আলুভাজা, ব্রাউন ব্রেড আর সালাদ। এখানকার অমলেটগুলো একটু অন্যভাবে বানানো হয়। খেতেও দারুণ লাগে। খাওয়া শেষে আবার হাঁটতে হাঁটতে উঁচু উঁচু ভবনের ফাঁক গলে ঢুকে পড়লাম মেট্রো স্টেশনে।

হোটেলে ফিরে দ্রুত স্নান সেরে তৈরি হতে হবে। কারণ, সামনে অপেক্ষা করছে কনফারেন্সের মঞ্চ আর সেখানে আমার গবেষণার গল্প শোনানোর পালা।
কনফারেন্সের দ্বিতীয় দিন ছিল আমার বক্তব্যের দিন। যে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করলাম, তার বিষয় ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কীভাবে কনসালট্যান্ট চিকিৎসকেরা দূরের হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকা প্রিম্যাচিউর শিশুদের ঝুঁকি নির্ধারণ বা রিস্ক স্কোরিং করতে পারেন। আসলে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন লেখক

অনেক সময় বড় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা প্রত্যন্ত এলাকার হাসপাতালে সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেন না। যদি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে সেই শিশুদের বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ডেটা বিশ্লেষণ করে দ্রুত ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায়, তাহলে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। বক্তব্য শেষ হতেই অডিটোরিয়ামজুড়ে দারুণ হাততালি।

গবেষণার গল্পটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বুঝতে পেরে নিজের ভেতরও একধরনের স্বস্তি অনুভব করলাম। এধরনের আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পৃথিবীর নানা প্রান্তের গবেষকেরা ঠিক কোন কোন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। প্যানেল আলোচনাগুলোয় প্রায়ই উঠে আসে সময়ের সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রশ্নগুলো। একটি আলোচনার বিষয় ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ ও এর নৈতিকতা। এই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের প্রেক্ষাপটে উন্নত দেশগুলো ও জাতিসংঘের কী ধরনের নীতি গ্রহণ করা উচিত, তা নিয়ে বেশ প্রাণবন্ত আলোচনা চলছিল।

বন্ধু উজ্জ্বল দাসের সঙ্গে

এরই মধ্যে দুপুরবেলায় ফোন এল উজ্জ্বলদার।
ওপাশ থেকে সেই চেনা কণ্ঠ—
‘তুই কই, ভাই?’
ঠিকানা বলতেই ব্যস! বেলা তিনটার দিকে উজ্জ্বলদা গাড়ি নিয়ে কনফারেন্স ভেন্যুর সামনে এসে হাজির। প্রায় সাত-আট বছর পর দেখা। তারপর পুরোটা সন্ধ্যা কেটে গেল উজ্জ্বলদা আর সিন্ধুদার সঙ্গে আড্ডায়। টরন্টোর আধুনিক শহরের মাঝখানে বসে হঠাৎ করেই যেন জীবন্ত হয়ে উঠল শিবগঞ্জের সেই টিনশেড মেসবাড়ি। কিংবা কারাগার মেসের সেই সোনাঝরা সন্ধ্যাগুলো! অন্তহীন আড্ডা, হাসি, গল্প আর স্বপ্নে ভরা দিনগুলো। সময় যেন এক অদ্ভুত খেয়ালে মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে গেল বহু বছর।

আর আমরা তিনজন এক সন্ধ্যার জন্য আবার ফিরে গেলাম সেই ছাত্রজীবনের সহজ, নির্ভার সময়টায়। এভাবে গল্প করতে করতে কখন যে সময় গড়িয়ে গেছে, টেরই পাইনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, রাত প্রায় দশটা। অগত্যা আড্ডার ইতি টেনে এবার হোটেলের পথে ফিরতে হবে। সামনে অপেক্ষা করছে কনফারেন্সের আরও একটি ব্যস্ত দিন, আর তার সঙ্গে টরন্টো শহরের নতুন নতুন গল্প। (চলবে)

Read full story at source