স্থানীয় সরকারে প্রশাসক, শূন্যতা পূরণ নাকি দখলের নতুন রাজনীতি

· Prothom Alo

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা এক অনিশ্চিত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। চারদিকে একধরনের দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদভিত্তিক শাসনব্যবস্থার উত্থানের আশঙ্কাও ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একধরনের আপাত–স্বস্তি ও রাজনৈতিক স্থিতি এনে দেয়। একটি তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।

Visit truewildgame.online for more information.

সংগত কারণেই দলটির ওপর এখন বর্তেছে গণ–অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের গুরুদায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকারের পতন ঘটায়নি; এটি নাগরিকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছে—গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠিত হবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে সদ্য গঠিত সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ সেই প্রত্যাশাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আইনের দৃষ্টিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট শূন্যতা—নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ, কারাবরণ বা দেশত্যাগ—একটি প্রশাসনিক সংকট তৈরি করেছিল। সে প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য আমলাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল।

কিন্তু নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের প্রচেষ্টা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে?

প্রথমত, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করলে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চোখে পড়ে। এদের একটি বড় অংশ সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে পরাজিত হয়েছেন, অথবা মনোনয়ন প্রত্যাশা করেও বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে এই নিয়োগকে একটি ‘রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ’ অথবা ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এটি দলীয় নেতাদের সন্তুষ্ট রাখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব ধরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে।

প্রশাসক নিয়োগের এই উদ্যোগ হয়তো তাৎক্ষণিক কিছু রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর ও জটিল

দ্বিতীয়ত, এই উদ্যোগ দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন প্রাপ্তি ও পদবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে। প্রশাসক পদে নিয়োগের মাধ্যমে একটি বড় অংশকে ‘অ্যাডজাস্ট’ করা সম্ভব, যা স্বল্প মেয়াদে দলীয় স্থিতিশীলতা আনতে পারে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় সংগঠনকে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও এই পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আওয়ামী লীগ আমলে দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় থাকতে পারেনি। স্থানীয় জনগণ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ কমে গিয়েছিল। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সম্পদ বণ্টনের ওপর সরাসরি প্রভাব রাখতে পারবেন, যা তাঁদের রাজনৈতিক ভিত্তি সুসংহত করবে।

তবে এই রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মাত্রাও রয়েছে, যা আরও গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ শুধু প্রশাসনিক ইউনিট নয়; এগুলো হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পদ ও উন্নয়ন বাজেটের প্রবাহের কেন্দ্র। স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ হয়, তার একটি বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ব্যয় হয়। নির্বাচিত পরিষদ না থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কার্যত এককভাবে প্রশাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এতে জবাবদিহির ঘাটতি তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক প্রশাসকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে, কারণ তাদের জবাবদিহি মূলত জনগণের প্রতি নয়, বরং দলীয় কাঠামোর প্রতি বেশি থাকে।

এই পরিস্থিতি একটি নতুন ‘রেন্ট-সিকিং’ অর্থনীতির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। উন্নয়ন প্রকল্প নির্বাচন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ—এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে যে সম্পদ নাগরিকদের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা, তার একটি অংশ অদৃশ্য পথে অন্যত্র সরে যেতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা নতুন নয়। অতীতেও জেলা পরিষদ বা সিটি করপোরেশন অনেক সময় ‘পুনর্বাসন কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বর্তমান উদ্যোগ সেই ধারাবাহিকতারই একটি নতুন সংস্করণ কি না, তা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সংশয় তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্থানীয় সরকারব্যবস্থার চরিত্রগত পরিবর্তন। একসময় এই ব্যবস্থায় দলীয় প্রতীকের বাইরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো, যা স্থানীয় নেতৃত্বকে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও জনগণমুখী রাখত। কিন্তু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালুর পর থেকে স্থানীয় সরকার ক্রমেই জাতীয় রাজনীতির সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছে। বর্তমান প্রশাসক নিয়োগ সেই দলীয়করণকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ফলাফল কী হতে পারে? প্রথমত, নাগরিকদের সেবা প্রাপ্তি আরও ব্যাহত হতে পারে। কারণ, প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পাবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হবে। কারণ, জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকদের আস্থা আরও ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—বিকল্প কী? উত্তরটি খুব জটিল নয়, কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন। স্থানীয় সরকারে দ্রুত, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের কোনো বিকল্প নেই। জনপ্রতিনিধিত্বই গণতন্ত্রের ভিত্তি, এবং স্থানীয় পর্যায়ে সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো গণতান্ত্রিক কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তবে শুধু নির্বাচনই যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারও জরুরি। দলীয় প্রতীকের প্রভাব কমিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আর্থিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত অর্থে স্বশাসিত হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো একটি কার্যকর রূপরেখা দিতে পারে। সেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক, কার্যকর এবং নাগরিকমুখী করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, প্রশাসক নিয়োগের এই উদ্যোগটি হয়তো তাৎক্ষণিক কিছু রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গভীর ও জটিল। গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তার সঙ্গে এই পদক্ষেপ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজে দেখা জরুরি।

স্থানীয় সরকারে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা মানে শুধু ভোটের আয়োজন নয়; বরং নাগরিকদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। সেই পথে হাঁটতে হলে প্রশাসক নয়, জনগণের প্রতিনিধি—এই নীতিতে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো টেকসই বিকল্প নেই।

  • ড. কাজী মারুফুল ইসলাম অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source