নীল নদে মাছের বদলে প্লাস্টিক খুঁজলে বেশি আয়, বুড়িগঙ্গায় কী
· Prothom Alo

ভোর ছয়টা। কায়রো শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া নীল নদে নৌকা ভাসিয়েছেন মোহাম্মদ আহমেদ সাইয়েদ মোহাম্মদ নামে এক জেলে। একসময় এই নৌকায় বসে তিনি মাছ ধরতেন। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি খুঁজছেন প্লাস্টিক বোতল।
‘প্লাস্টিকের গুমট আক্রমণে মাছ পালিয়ে গেছে’, বলছিলেন ৬০ বছর বয়সী এই জেলে। ১৪ বছর আগেও শীতকালে তিনি দিনে ২৫ কেজি মাছ ধরতেন। এখন সেই পরিমাণ নেমে এসেছে ৪–৫ কেজিতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখন মাছ না, প্লাস্টিকই তাঁর আয়ের বড় উৎস।
Visit amunra-online.pl for more information.
কায়রোর আল-কুরসায়া দ্বীপে প্রায় ২০০ পরিবার বাস করে। এখানে সাইয়েদ মোহাম্মদের পরিবার থাকে। তাঁর পরিবারে ১২ নাতি। এখানে থাকেন প্রায় ১৮০ জন জেলে। তাঁরা এখন আর শুধু মাছ ধরেন না, তাঁরা নদীও পরিষ্কার করেন। নদী থেকে প্লাস্টিক সংগ্রহ করেন। কারণ, নদীতে মাছ কমে যাওয়ার পেছনে দায়ী ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণ।
২০১৮ সালে ভেরিনাইল নামের একটি উদ্যোগ শুরু হয়। এটি জেলেদের কাছ থেকে বাজারদরের চেয়েও বেশি দামে প্লাস্টিক কিনে নেয়। ফলে মাছ না পেলেও জেলেরা প্লাস্টিক সংগ্রহ করে ভালো আয় করতে পারছেন। এক কেজি প্লাস্টিক এখন ৩৩ মিশরীয় পাউন্ডে বিক্রি হয়। টাকায় প্রায় ৭৭ টাকা। প্লাস্টিকের বাইরে টিনের ক্যানের দাম আরও আরও বেশি।
পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো নদী কোনটিগ্রীষ্মকালে সাইয়েদ প্রতিদিন প্রায় ২০ কেজি প্লাস্টিক সংগ্রহ করেন। শীতকালে মাসে ২ লাখ ৮০ হাজার থেকে ৪ লাখ ২৩ হাজার টাকা আয় করেন। এই আয়ে তিনি তিন সন্তানের বিয়ে দিয়েছেন। এমনকি বড় ছেলের জন্য একটি ছোট ক্যাফেও তৈরি করেছেন।
মাছ না পেলেও জেলেরা প্লাস্টিক সংগ্রহ করে ভালো আয় করতে পারছেনএই উদ্যোগ শুধু নদী পরিষ্কারই করছে না, বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবন। নারীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসা সহায়তা তৈরি হয়েছে। এমনকি কৃষকদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সতর্কবার্তা। নদী যদি দূষিত হয়, তাহলে শুধু মাছ নয়, বদলে যায় পুরো জীবিকার ধরন।
নীল নদ থেকে বুড়িগঙ্গা বেশ দূরের এক নদী। তবে দূষণে এদের মিল আছে। বুড়িগঙ্গায় শীতকালে কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি খুব ‘স্বাভাবিক’ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী কেন সোজা পথে না গিয়ে এঁকেবেঁকে চলেঢাকার পাশে বয়ে যাওয়া এই নদী একসময় ছিল প্রাণবন্ত। ছিল মাছ, নৌকা আর জেলে। কিন্তু এখন বুড়িগঙ্গার পানি কালো, দুর্গন্ধময়। শিল্পকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক, ট্যানারির রাসায়নিক, সব মিলিয়ে নদীটি বিষাক্ত পানির স্রোতে পরিণত হয়েছে।
এখনও কিছু জেলে মাছ ধরেন বুড়িগঙ্গায়। তাঁরা অভিযোগ করেন, জাল ফেললে মাছের বদলে উঠে আসে সাকার ফিশএই দূষণের ফলে বুড়িগঙ্গায় দেশি মাছ কমে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এক অদ্ভুত বিদেশী মাছ। নাম সাকার ফিশ। এই মাছ দূষিত পানিতে সহজে বেঁচে থাকতে পারে। দ্রুত বংশবিস্তার করে। অন্য মাছের খাদ্য কেড়ে নেয়, ডিম-পোনা খেয়ে নেয়। ফলে স্থানীয় মাছ আর তেমন নেই। কিছু শিং মাছ পাওয়া যায়।
এখনও কিছু জেলে মাছ ধরেন বুড়িগঙ্গায়। তাঁরা অভিযোগ করেন, জাল ফেললে মাছের বদলে উঠে আসে সাকার ফিশ। কিন্তু এই মাছের বাজারমূল্য নেই। তাই তাঁদের মাছ ধরে আয়ও নেই।
নীল নদের জেলেরা প্লাস্টিক তুলে জীবিকার খোঁজ করছে। বুড়িগঙ্গার জেলেরা সরে গেছেন নিজেদের পেশা থেকে। এখন এমন প্রকল্প প্রয়োজন, যেখানে জেলেদের কথা ভাবা হবে, নদী-মাছ রক্ষা পাবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ানপৃথিবীর সবচেয়ে ছোট নদী কতটা ছোট