শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
· Prothom Alo

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইআইডি ও প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত ‘শিক্ষায় নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৪ মার্চ ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
Visit chinesewhispers.club for more information.
অংশগ্রহণকারী:
ববি হাজ্জাজ, প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়; ইলিরা দেওয়ান, কমিশনার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন; আসিফ সালেহ, নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক; শিখা গোমেজ, অধ্যক্ষ, হলিক্রস স্কুল ও কলেজ; সাঈদ আহমেদ, নির্বাহী প্রধান, আইআইডি; প্রিয়াঙ্কা গোপ, চেয়ারপার্সন, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; দীপা শংকর, শিক্ষা বিভাগের প্রধান, ইউনিসেফ বাংলাদেশ; সামিয়া হক, অধ্যাপক ও ডিন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্কুল অফ জেনারেল এডুকেশন; সুমেরা আহসান, অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় সমন্বয়কারী, নলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম অব জিপিই; স্নিগ্ধা রেজওয়ানা, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; শিরিন আক্তার, প্রোগ্রাম অফিসার (শিক্ষা), ইউনেস্কো; মো. হারিছ উদ্দিন, সহকারী পরিচালক (এসিআর শাখা), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর; ফাহমিদা শবনম, শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ, ইউনিসেফ বাংলাদেশ; আয়শা জাহান, সিনিয়র শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, মনিপুর স্কুল ও কলেজ; সমীর রঞ্জন নাথ, প্রোগ্রাম প্রধান, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন: সানজিদা রহমান, সিনিয়র যুগ্ম পরিচালক, আইআইডি এবং প্রধান, ইয়ুথ ফর পলিসি; কাজী ফেরদৌস পাভেল, সিনিয়র যুগ্ম পরিচালক আইআইডি; মো. রমজান, সিনিয়র সহকারি পরিচালক, আইআইডি; ইমন কাজী, সহকারি পরিচালক, আইআইডি; ফারিয়া সাদাফ, সহকারি পরিচালক, আইআইডি। সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
আলোচনা
ববি হাজ্জাজ
প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়
শিক্ষা খাত আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতির ভবিষ্যৎ, আমাদের তরুণ সমাজ এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে শিক্ষার বাজেট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের কাছাকাছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি হলো এটিকে ৫ শতাংশে উন্নীত করা। বাজেট বাড়ানো যেমন জরুরি, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সফলতা মাপা হয় কত টাকা খরচ হলো তার ভিত্তিতে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল কতটা উন্নত হলো সেদিকে যথেষ্ট নজর থাকে না। এই লক্ষ্যভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি আমাদের ঠিক করতে হবে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আমি অসংখ্য শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যাগুলো জটিল। এসব সমস্যার সমাধান আমাদের ধীরে ও সুশৃঙ্খলভাবে করতে হবে। অনেক পরিবর্তনের ফল হয়তো ছয় মাসে দৃশ্যমান হবে না, কিন্তু আমরা সিস্টেম বদলের কাজ শুরু করব।
শিক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য আমি তিনটি বিষয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি—কারিকুলাম, ক্লাসরুম ও ধারাবাহিকতা। কারিকুলাম সঠিক হতে হবে, ক্লাসরুমে কার্যকর শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে হবে এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ভালো এবং ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক শিক্ষার্থী কিছু না শিখেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে। শিক্ষাকে আরও ফলপ্রসূ করতে হলে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিকুলাম উন্নয়ন এবং শেখার ফলাফলের ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়ানো প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিকরণ ও দুর্নীতির কারণে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আমরা ধীরে ধীরে কিছু সংস্কার আনতে চাই। বেসরকারি টিউশন কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে তা এক দিনে করা সম্ভব নয়। পাইলট প্রকল্পের পাশাপাশি নাগরিক শিক্ষা, পরিবেশ সচেতনতা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চাকে শিক্ষার অংশ হিসেবে শক্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইলিরা দেওয়ান
কমিশনার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকসংকট প্রকট। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার একটি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ১১টি পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র ছয়জন। রাঙামাটির লংগদু সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের অবস্থা আরও ভয়াবহ—চারটি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন, একজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষক। এ অবস্থায় শিক্ষাব্যবস্থার মান কীভাবে উন্নত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কলেজের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজের জন্মলগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত আইসিটির কোনো শিক্ষক নেই। বিজ্ঞানের শিক্ষক অপ্রতুল। একটি জেলা সদর সরকারি কলেজের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি সহজেই অনুমান করা যায়।
ঢাকার নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা কীভাবে সমানভাবে প্রতিযোগিতা করবে—এই বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ায় অনেক সময় দূরবর্তী অঞ্চলে অন্য জেলার শিক্ষক পাঠানো হয়। তিনি হয়তো কিছুদিন থাকেন; পরে সুযোগ পেলেই অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে শিক্ষকশূন্যতা থেকেই যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক শিক্ষক নিজেদের পদ অন্যের কাছে দিয়ে জেলা সদর বা ঢাকায় অবস্থান করেন। এতে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়।
হাওর, উপকূল বা পাহাড়ের একজন শিক্ষার্থীকে যদি ঢাকার শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, তবে তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মাতৃভাষায় প্রাক্–প্রাথমিক শিক্ষা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদ্রি—এ পাঁচটি ভাষায় বই তৈরি হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। ফলে বইগুলো ব্যবহারই করা যায় না। আমার প্রস্তাব হলো, একটি পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে যাঁরা এসব ভাষা জানেন, তাঁদের খণ্ডকালীনভাবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এতে আদিবাসী শিশুরা তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাবে—যে সুযোগ আমি নিজে শৈশবে পাইনি।
আসিফ সালেহ
নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গোড়ায় এত সমস্যা যে একসঙ্গে সবকিছুর সমাধান করা সহজ নয়। সমস্যার গভীরে না গিয়ে যদি আমরা শুধু চমক দেখানোর চেষ্টা করি, তাহলে আবারও প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়নের ফাঁদে পড়ে যাব। বাস্তবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক মৌলিক সমস্যা রয়েছে। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। কোথাও একজন শিক্ষক অসুস্থ হলে বা মাতৃত্বকালীন ছুটিতে গেলে বিকল্প শিক্ষক থাকে না। এমনও দেখা যায়, কোনো শিক্ষক প্রশিক্ষণে গেলে পুরো স্কুলে দপ্তরী ছাড়া আর কেউ থাকে না। আবার আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি বা প্রতিযোগিতার কথা বলি, কিন্তু স্কুলের ক্যালেন্ডার দেখলে বোঝা যায়, বছরের বেশির ভাগ দিনই ছুটিতে চলে যায়। তাহলে শিক্ষার্থীরা পড়বে কখন? শিক্ষককে যদি শ্রেণিকক্ষেই না পাওয়া যায়, তবে প্রত্যাশিত ফলাফল কীভাবে আসবে?
একবার মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এক শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তখন বেলা ১১টা, অথচ তিনি স্কুলে নেই। জানতে চাইলে তিনি বললেন, মাস শেষে বেতন তিনি পাবেনই—স্কুলে যান বা না যান। বেতনের টাকায় সংসার চলে না, তাই তিনি ব্যবসা করেন এবং বিকেলে প্রাইভেট পড়ান। প্রশ্ন হলো তাঁকে জবাবদিহির মধ্যে আনছে কে? উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ যাঁরা দায়িত্বে আছেন, তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করা গেলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রকল্পভিত্তিক চিন্তাভাবনা। শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, প্রকল্পের নকশা কতটা কার্যকর—সেদিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কিছু কাঠামোগত সমস্যা আছে। নতুন কোনো কোর্স চালু করতে গেলে অনুমোদন প্রক্রিয়া এত দীর্ঘ যে তত দিনে শিল্প খাত অনেক দূর এগিয়ে যায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হয় না। শিক্ষাব্যবস্থার এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের ভূমিকা শুধু বাস্তবায়নকারী নয়, বরং সহায়ক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
শিখা গোমেজ
অধ্যক্ষ, হলিক্রস স্কুল ও কলেজ
সম্প্রতি বুয়েটে ভর্তি হওয়া আমাদের ৩২ জন শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চেয়েছি, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সামনে কথা বলার সুযোগ পেলে তারা কী বলতে চায়। আমার শিক্ষার্থীরা কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলেছে। প্রথমত, সারা দেশে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং শিক্ষকদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক শিক্ষার ক্লাসগুলোও নিশ্চিত করা জরুরি। তারা আরও বলেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে যে দুর্নীতি রয়েছে, সেটি বন্ধ না হলে অনেক ভালো পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে তারা অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার কথাও বলেছে। অনেক শিক্ষার্থী পারিবারিক সমস্যার মুখোমুখি হয়, যা তাদের পড়াশোনা ও মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। তাই প্যারেন্টস কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
আমরা যখন নতুন করে শিক্ষা নিয়ে ভাবি, তখন প্রথম প্রয়োজন সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা। কেন আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি, কেন এত উদ্যোগের পরও প্রত্যাশিত ফল আসছে না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় স্থায়িত্বও প্রয়োজন। বারবার পরিবর্তন করলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। আমরা অবশ্যই বিশ্বমানের শিক্ষা চাই, যেখানে ব্যবহারিক শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, আইসিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন জ্ঞান যুক্ত হবে।
কারিকুলামের পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন কিছু শিক্ষক কোচিং বা শিক্ষা–বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছেন, সেটিও আমাদের বুঝতে হবে। একই সঙ্গে আইকিউ ও ইকিউয়ের ভারসাম্য, লিঙ্গসমতা এবং নারীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব দিকগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। কাগজে–কলমে উচ্চমাধ্যমিক দুই বছর হলেও বাস্তবে নিয়মিত ক্লাসের সময় অনেক কমে যায়। এত ছুটির মধ্যে কার্যকর শিক্ষা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি আমার শিক্ষার্থীদের দিতে চাই, কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজনীয় সুযোগ না থাকায় অসহায় বোধ করি।
সাঈদ আহমেদ
নির্বাহী প্রধান, আইআইডি
বাংলাদেশে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা। ভর্তি হার বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি হলেও বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো শিশুরা আসলে কী শিখছে এবং পরবর্তী সময় সেই শিক্ষা দক্ষতা অর্জন ও কর্মজীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে।
আইআইডি ও অংশীদারদের সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যায়ের খানাভিত্তিক মূল্যায়নে (ইন্টারন্যাশনাল কমন অ্যাসেসমেন্ট অব নিউমারেসি অ্যান্ড রিডিং) দেখা গেছে, ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশ পড়া ও গণিত—দুই বিষয়েই ন্যূনতম মান অর্জন করেছে। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৩ শতাংশ। একটি অনুচ্ছেদ পড়ে সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারার মতো সক্ষমতা আছে ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর। আর সাধারণ শব্দ-সমস্যা সমাধান করতে পারে মাত্র ৫২ শতাংশ। একই মূল্যায়নে ৫৭ শতাংশ শিক্ষার্থীর প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরতার চিত্রও উঠে এসেছে।
আইআইডির আরেকটি জাতীয় পর্যায়ের খানাভিত্তিক জরিপে দেখা যায়, ৩৯ শতাংশ অভিভাবক আর্থিক অস্বচ্ছলতাকে ঝরে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাল্যবিবাহ, সামাজিক চাপ এবং শিক্ষার উচ্চ ছায়া-ব্যয়ও অনেক শিশুর জন্য শিক্ষায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে। অর্থাৎ একদিকে শেখার ঘাটতি পূরণে পরিবারকে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সেই ব্যয়ই ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলো পড়ালেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, স্কুলেই বিনা খরচে ক্যাচ-আপ সেশন চালু করা, প্রয়োগভিত্তিক গণিতের নিয়মিত চর্চা নিশ্চিত করা, ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহ রোধে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানো এবং স্কুলের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার ধারায় ফিরিয়ে আনা।
প্রিয়াঙ্কা গোপ
চেয়ারপারসন, সংগীত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শিশুদের চিন্তার জায়গা আজ হ্রাস পেয়েছে, মুখস্ত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে, হাইলি স্ক্রিন টাইমের কারণে ফোকাল পয়েন্ট কমে গেছে। এতে তাদের সৃজনশীলতা ও মননশীলতা বিকশিত হয় না, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু সংগীত ও নৃত্যশিক্ষা থেকে বঞ্চিত। পাঠ্যপুস্তক ও সিলেবাস শিশুদের জন্য কার্যকর নয়। শিক্ষকের দক্ষতার অভাব এবং অপ্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু শিশুদের আগ্রহ নষ্ট করছে। সংগীতশিক্ষা শুধু বিনোদন নয়, এটি মনন, নৈতিকতা এবং সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষিত সংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য কর্মক্ষেত্র নেই, ফলে সৃজনশীল সম্ভাবনা হারানো হচ্ছে।
সংগীতশিক্ষা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বয়স উপযোগী, আনন্দময় ও সৃজনশীল পদ্ধতিতে চালু হওয়া উচিত। এটি শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক শিক্ষা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
সরকারকে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং অংশীদারত্বমূলক প্রক্রিয়া গ্রহণ করার আহ্বান জানাই।
দীপা শংকর
শিক্ষা বিভাগের প্রধান, ইউনিসেফ বাংলাদেশ
প্রাথমিক স্তরে সর্বজনীন প্রবেশের কথা থাকলেও সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে লাখ লাখ শিশু এখনো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে। বাংলাদেশের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে পাঠদানের দিন বিশ্বমানের তুলনায় খুবই কম, বছরে মাত্র ১৮০ দিন, যা বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে আরও সংকুচিত হয়। তাই শিক্ষার মান উন্নয়নে সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর ক্যালেন্ডার অপরিহার্য।
শিক্ষা খাতের সংস্কার এবং সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশ নীতি ও কর্মসূচিতে কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত। শিক্ষার মান নিয়ে বিদ্যমান তথ্য ও প্রমাণ পুনর্নির্মাণ না করে সমন্বয় ও বিশ্লেষণ করা জরুরি। সরকারি বিনিয়োগ সীমিত হওয়ায় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যয়ের ৯০ শতাংশ অভ্যন্তরীণ পাবলিক খাত থেকে আসে, যা বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণের ওপর নির্ভরশীল নয়। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা খাতের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বাস্তবিক সমাধান, সময় ব্যবস্থাপনা, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং অংশীদারত্ব মূল চাবিকাঠি।
সামিয়া হক
অধ্যাপক ও ডিন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি স্কুল অব জেনারেল এডুকেশন
আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষেত্রে প্রস্তুত নয়। কারিকুলামকে সমসাময়িক, প্রাসঙ্গিক ও বাস্তবসম্মতভাবে পুনর্বিন্যস্ত করা জরুরি। শিক্ষার্থীর শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান নয়, সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষমতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চশিক্ষায় কাজের মাধ্যমে শেখা, আন্তসাংস্কৃতিক শিক্ষা, কমিউনিটি সেবা এবং ক্লাসরুমের বাইরে অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার সুযোগ কার্যকর করা উচিত, যাতে তারা শুধু প্রকল্পের জন্য নয়, সমস্যার সমাধান ও জ্ঞান সৃষ্টির জন্য গবেষণা করতে পারে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব ও সক্রিয় নাগরিকত্বের সঙ্গে সমন্বিত করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা ও ধরন পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষায় উদ্ভাবন ও শিক্ষকের দক্ষতা উন্নয়ন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করবে। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের কেবল কর্মী নয়, ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে গড়ে তুলবে এবং দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সুমেরা আহসান
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় সমন্বয়কারী, নলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম অব জিপিই
আমরা বহুবার শিক্ষা খাতের সমস্যা চিহ্নিত করেছি, কিন্তু ছোট ছোট উদ্যোগগুলো একে–অপরের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকার কারণে সিস্টেমে স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি। প্রি–সার্ভিস শিক্ষক শিক্ষা বা শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়নের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু তা শিক্ষক নিয়োগ বা নীতির সঙ্গে সংযুক্ত না হলে কার্যকর হয় না। এ জন্য খাতভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্র সমন্বিতভাবে কাজ করবে। পাশাপাশি শিক্ষার নীতিকে এমন আকারে তৈরি করতে হবে, যাতে ভালো পরিবর্তনগুলো সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে না যায়।
মূল্যায়ন আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল চ্যালেঞ্জ। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বর্তমানে লিখিত পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ, যা বিভিন্ন ধরনের বুদ্ধিমত্তা বা সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ দেয় না। সঠিক, বৈধ ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন দরকার। এটি শুধু নম্বর নয়, বরং ফিডব্যাক ও মেন্টরিংভিত্তিক হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ করতে পারে।
শুধু গণিতে বা ভাষায় পারদর্শী হওয়া যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের হতে হবে ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং ভবিষ্যতের নেতা। এ জন্য বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি, যেমন সংবাদপত্র তৈরি, গোলটেবিল বৈঠক বা প্রদর্শনী অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা
সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার ক্ষেত্র এখনো সম্পূর্ণ সমান নয়। চর অঞ্চলের শিশু আর ঢাকার শিশুর শিক্ষা এক নয়। ক্লাস সেভেনে অনেক শিক্ষার্থী ই–মেইল বা গুগল ব্যবহার করতে জানে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও গুগল ক্লাসরুমের বেসিক ব্যবহার জানেন না। প্রক্রিয়া, যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ এমনভাবে সাজানো হয়নি, যাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমানভাবে উপকৃত হন।
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের নাগরিক ও পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য ছোট ছোট কাজ জরুরি। স্কুল শুরু হওয়ার আগে কি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়? উত্তর হচ্ছে ‘না। জাতীয় সংগীত কী, কেন গাওয়া হয় এবং যখন তা বাজে তখন কীভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে হয়— অনেক শিক্ষার্থী তা না বুঝেই বড় হচ্ছে।
শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও অ্যাসাইনমেন্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্পষ্ট নীতি প্রণয়ন প্রয়োজন। প্রতিটি নীতি বাস্তবমুখী হতে হবে, যেন শিক্ষার্থী শুধু পড়াশোনা নয়, জীবনও শিখতে পারে। নতুন সরকারকে অনুরোধ, এই ছোটখাটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে কার্যকর করার মাধ্যমে শিক্ষার মান ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা হোক।
ফাহমিদা শবনম
শিক্ষা কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ ইউনিসেফ বাংলাদেশ
মাধ্যমিক শিক্ষায় এখন প্রাথমিকের সর্বজনীন অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলেও বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত ফলাফল ও কর্মসংযোগ। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২-এ দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণির অর্ধেক শিক্ষার্থী বাংলা ও গণিতের ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। অষ্টম শ্রেণিতে গিয়ে গ্যাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীরা সিস্টেমের মধ্যে থাকলেও মৌলিক দক্ষতা আয়ত্ত করতে পারছে না। এর প্রভাব যুবসমাজের কর্মসংযোগে পড়ছে।
নতুন সরকারের জন্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে শিক্ষাব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা ও শিক্ষার্থীর ক্লাসে উপস্থিতির সময় সুরক্ষিত করা। স্কুলের একাডেমিক ক্যালেন্ডার ঠিক রাখা, সময়মতো বই ও শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার পাশপাশি শিক্ষক পদ পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি। দ্বিতীয় কাজ হলো পরিষ্কার নীতি ও পরিকল্পনা তৈরি করা। বিদ্যমান একাধিক নীতি পর্যালোচনা করে তিন–পাঁচ বছরের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করলে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সংস্কার বাস্তবসম্মত হবে।
মৌলিক শিক্ষাকে জোরদার করতে হবে। সঠিক শিক্ষাদর্শন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও নির্দিষ্ট সহায়কব্যবস্থা কার্যকর ও সাশ্রয়ী। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে শিক্ষক উন্নয়ন ও সিস্টেম শক্তিশালী করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। শিক্ষার সংস্কারগুলো যদি আন্তর্জাতিক মান ও এসডিজি এজেন্ডার সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়, মৌলিক পড়াশোনা নিশ্চিত করা সম্ভব।
মো. হারিছ উদ্দিন
সহকারী পরিচালক (এসিআর শাখা), মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর
শিক্ষা সংস্কারে প্রথম ধাপ হলো, সঠিক সমস্যা চিহ্নিত করা। সমস্যা জানলে সমাধান করা সম্ভব। এ জন্য একটি অ্যাসেসমেন্ট কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যাতে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করা অভিজ্ঞ শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার ওপর লেখালেখি করা সাংবাদিকেরা অন্তর্ভুক্ত থাকেন। ১৮০ দিনের মধ্যে তাঁরা রিপোর্ট উপস্থাপন করবেন এবং তার ভিত্তিতে সরকার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় মনোযোগ দেওয়া অতি জরুরি। বর্তমানে কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জিত হচ্ছে না। শিক্ষকের ঘাটতি প্রকট। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কিছু স্কুলে তিন–তিন শ শিক্ষার্থীর সঙ্গে এক বা দুজন শিক্ষক রয়েছেন। এই ঘাটতি পূরণ করা অপরিহার্য। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট রয়েছে। অনেক শিক্ষক একসঙ্গে দুই থেকে তিনটি ক্লাস দেখছেন। অনেক স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই।
ঢাকা শহরে, বিশেষ করে ডাবল শিফট চালু ১৭০ মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষক স্বল্পতার কারণে কার্যক্রম সীমিত। তাই নতুন সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শিক্ষকঘাটতি পূরণ, প্রধান শিক্ষক নিয়োগ, স্কুল সাপোর্ট সিস্টেম মজবুত করা এবং একাডেমিক কার্যক্রম স্থিতিশীল রাখা। ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করলে শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীর ফলাফল দ্রুত উন্নত হবে।
শিরিন আক্তার
প্রোগ্রাম অফিসার (শিক্ষা), ইউনেসকো
শিক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, প্রশিক্ষিত ও উদ্যমী শিক্ষক নিশ্চিত করা। অনেকে শিক্ষক পেশায় আসেন চাকরির অভাবের কারণে, অথচ তাঁদের কার্যকরভাবে নিয়োগ ও ধরে রাখা নিশ্চিত করা হয় না। এ জন্য একটি সম্পূর্ণ শিক্ষক নীতিমালা প্রয়োজন, যা প্রাথমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয় পর্যন্ত কার্যকর হবে। শিক্ষকের নিয়োগ, কর্মদক্ষতা, প্রত্যয়ন ও নীতিগত পরিবেশ—সব মিলিয়ে তাঁদের পেশাদার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক হলেন কেন্দ্রবিন্দু; তাঁরা দক্ষ না হলে শিক্ষার্থীর মানসম্মত শিক্ষা অসম্ভব।
শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে নীতি ও প্রক্রিয়া গভীরভাবে নিরীক্ষণ জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অন্যান্য খাতের সঙ্গে সংযোগ থাকা প্রয়োজন। সরকারি প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ ও বিকেন্দ্রীকৃত করা দরকার। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সংযোগ কার্যকর করা হলে নীতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহজতর হবে।
শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে শুধু পাঠ্যক্রম নয়, নৈতিকতা, ডিজিটাল সচেতনতা, সৃজনশীল দক্ষতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধও অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। মূল্যায়ন বহুমুখী হতে হবে, শুধু পরীক্ষার নম্বর নয়, প্রকল্প, অনুশীলন, দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ, বনভোজন, সৃজনশীল কার্যক্রম ও দক্ষতা বিকাশও মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে।
আয়শা জাহান
সিনিয়র শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, মনিপুর স্কুল ও কলেজ
আমি মাঠপর্যায়ের শিক্ষক হিসেবে দেখেছি, বেশির ভাগ স্কুলে প্রকৃত শিক্ষকের অভাব ভয়াবহ। শিক্ষকতা অনেকের পেশা নয়, তাঁরা আপাতত চাকরির অভাবে এখানে আসেন, ভালোবেসে আসেন খুব কম। এই সংকট কমাতে শিক্ষকের যথাযথ নিয়োগ, পরীক্ষণ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের আগে শিক্ষককে অন্তত তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত, যেখানে পোশাক, ভাষা, আচরণ ও আন্তরিকতা শেখানো হবে।
শিক্ষার্থী মেধা সঙ্গে নিয়ে আসে, কিন্তু তার বিকাশ আমাদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। তাই শিক্ষককে দলীয় রাজনীতি ও পক্ষপাত থেকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন। তথ্য ও ইতিহাস প্রদানে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বাইরে সংস্কৃতি চর্চা ও প্রজেক্টভিত্তিক কার্যক্রমে অভ্যস্ত করা জরুরি।
ফোর–জি শিক্ষাপদ্ধতি—ক্রিটিক্যাল থিঙ্কিং, সৃজনশীল চিন্তা, সহযোগিতা ও যোগাযোগ—শ্রেণিকক্ষে কার্যকর করা হলে শিক্ষার্থীরা শুধু শোনার চেয়ে দেখতে ও করতে বেশি অভ্যস্ত হবে। মূল্যায়ন প্রথা পরিবর্তন করে নিয়মিত কুইজ, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে।
প্রাথমিক শিক্ষকেরা অনেক সময় শ্রেণিকক্ষের বাইরে জরিপ, উপবৃত্তি ও প্রশাসনিক কাজের ভারে ক্লান্ত। তাই তাঁদের পাঠদানের সময় ও মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সমীর রঞ্জন নাথ
প্রোগ্রাম প্রধান, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্ট
আমার মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা বলছে, শিক্ষার প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষার্থীদের শিখন দুর্বলতা। রাজনৈতিক সরকার প্রায়ই চমক দেখানোর চেষ্টা করে, কিন্তু আসল সমস্যাগুলো আমরা আগেই জানি। নতুন সরকার ক্লাসরুমে মনোযোগী হলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক যেন শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ও শেখার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। পরীক্ষানির্ভর শিক্ষার চাপে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করে, প্রাইভেট টিউটর বা গাইড বইয়ের ওপর নির্ভর করে, ফলস্বরূপ শিখন কম হয়।
শিক্ষকের সংকট গভীর। প্রাথমিক শিক্ষকদের ২৫ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষকদের এক–তৃতীয়াংশ ও মাদ্রাসার ৯০ শতাংশ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। অনেক শিক্ষকের বিএড ডিগ্রি নেই, ইংরেজি ও গণিত শিক্ষক যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া পড়াচ্ছেন। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে শিক্ষকদের যথাযথ নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আমার প্রস্তাব—সরকার লক্ষ্য নির্ধারণ করুক, কবে থেকে আর কোনো শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক থেকে পাঠ নেবে না। শিক্ষকের সার্টিফিকেট নবায়ন, প্রফেশনাল অ্যাসেসমেন্টের প্রক্রিয়া আনা দরকার। শিক্ষক একবার হওয়ায় সারা জীবনের শিক্ষক ধরা ঠিক নয়; মাঝেমধ্যে দক্ষতা যাচাই ও ঝালাই প্রয়োজন।
সুপারিশ
শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
মাননির্ভর পদ্ধতিতে শিক্ষক নিয়োগ, প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক চাপ কমানো, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাপদ্ধতি জোরদার করতে হবে।
পার্বত্য, হাওর, উপকূলীয় ও অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার মাধ্যমে সাম্যভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার কারিকুলাম ও কর্মদক্ষতা সমন্বিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকর তদারকি জোরদার করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মানবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে শিল্প, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও পরিবেশ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।