‘ইফতারের সময় আকুতি-মিনতি করেছি, একটু পানিও দেয়নি পুলিশ’

· Prothom Alo

কক্সবাজারের পেকুয়া থানার ভেতরে পুলিশ কর্তৃক মারধরের অভিযোগ ওঠে রেহেনা মোস্তফা (৪২) নামের এক নারী ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা বেগমকে (২১)। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান। তবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সেই সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলমের আদালত। গতকাল শনিবার বিকেল ৪টার দিকে আপিল শুনানি শেষে আদালত ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই সাজা বাতিল করেন।

সাজা বাতিলের পর শনিবার সন্ধ্যায় রেহেনা মোস্তফা ও তাঁর মেয়ে জুবাইদা কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরে তাঁরা চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

Visit goldparty.lat for more information.

এর আগে গত বুধবার বিকেলে পেকুয়া থানায় ডেকে নিয়ে এই দুই নারীকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে ওই দিন থানার ভেতরেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুজনকে এক মাস করে সাজা দেন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম। এরপর বুধবার সন্ধ্যায় মা-মেয়েকে কক্সবাজার কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তাঁর স্বামীর বিচ্ছেদ হয়। ২০১৩ সালে ২৩ মে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হলে সম্পত্তির ভাগের জন্য চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু তাঁরা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা করেন জুবাইদা। আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেয় পেকুয়া থানাকে। মামলার তদন্তভার যায় উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষের কাছে।

স্বজনদের অভিযোগ, এসআই পল্লব তদন্ত প্রতিবেদন দিতে রেহেনা ও তাঁর মেয়ে জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে তাঁকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। টাকা নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে প্রতিবেদন দেন তিনি। এতে টাকা ফেরত চেয়ে এসআই পল্লবের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেন রেহেনা ও জুবাইদা। তবে টাকা ফেরত না দেওয়ায় গত ১৩ জানুয়ারি এ বিষয়ে তাঁরা কক্সবাজার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে গতকাল রাত সাড়ে নয়টার দিকে কথা হয় ভুক্তভোগী রেহেনা মোস্তফার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে বুধবার আমাদের থানায় ডেকেছিল পুলিশ। আমি ও আমার মেয়ে থানায় গেলে পুলিশ আমাদের প্রচণ্ড মারধর করে। মারধরের পর থানায় ইউএনও আসেন। আমরা তাঁকে পুলিশের নির্যাতনের কথা বলি। তখন আমরা মনে করেছিলাম, ইউএনও স্যার আমাদের রক্ষা করতে এসেছেন। কিন্তু উনি আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখার পরও কিছু না বলে ওপরে (ওসির রুমে) চলে যান। ঘণ্টা দেড়েক পর সেখান থেকে নেমে যে যার মতো তাঁরা (ইউএনও-ওসি) চলে গিয়েছেন। এরপর পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়।’

রেহেনা মোস্তাফা বলেন, ‘হাসপাতালের কথা বলে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। রামু এলাকায় ইফতারের সময় হলে অনেক আকুতি-মিনতি করেছি, তবু একটু পানিও দেয়নি পুলিশ। অথচ ইফতারের জন্য তাঁদের হাতে জুস ছিল, এটা-ওটা ছিল। খালি পেটে কাজ আছে বলে আমাদের ইফতারটাও করতে দেয়নি।’

কারাগারে নেওয়ার পর তাঁদের শরীরের আঘাত দেখে কারা কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চাননি বলে দাবি রেহেনা মোস্তফার। তিনি বলেন, ‘প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চাননি। কারা কর্তৃপক্ষ বলেন, কাগজপত্র ঠিকমতো আনো, ওদের আঘাত বেশি। রাতে মারা গেলে আমরা কী জবাব দিব। পরে ইউএনওর সাথে কথা বলে ই-মেইলে কী কী কাগজপত্র পাঠানোর পর কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের গ্রহণ করেন। পরদিন সকালে আমরা জানতে পেরেছি আমাদের এক মাস করে সাজা দিয়েছেন ইউএনও।’

এই ঘটনায় ইউএনও, ওসি, এসআই পল্লব কুমার ঘোষ ও নির্যাতনকারী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দাবি করেন রেহেনা মোস্তফা। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমি আপনার পেকুয়ার মেয়ে, আমি নির্যাতিত, আমি সুষ্ঠু বিচার চাই।’

শুক্রবার ইউএনও মাহবুবুল আলম জানিয়েছিলেন, থানার ভেতর তাঁর সামনে পুলিশের ওপর হামলা হয়। তাই তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুজনকে সাজা দিয়েছেন। সাজার বিষয়ে মা-মেয়েকে সামনাসামনি জানানো হয়েছিল।

তবে মুক্তি পাওয়ার পর রেহেনা মোস্তফার অভিযোগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজার বিষয়ে তাঁরা থানায় অবস্থানকালে কিছুই জানতেন না। তাঁদের সামনে বিচারিক কার্যক্রম হয়নি। কক্সবাজার পৌঁছে কারাগারে প্রবেশের পরদিন সকালে সাজার বিষয়টি জানতে পেরেছেন।

রেহেনা মোস্তফার এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইউএনও মাহবুবুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তবে তিনি সাড়া না দেওয়ায় তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। থানায় নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে পেকুয়া থানার ওসিকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনিও সাড়া দেননি। তবে শুক্রবার সাংবাদিকদের ডেকে তিনি বলেছিলেন, ‘ওই দুই নারী খুবই উচ্ছৃঙ্খল। তাঁরা বিভিন্ন সময় থানায় এসে ধর্ষণ মামলার হুমকি দিতেন। বিষের বোতল হাতে করে নিয়ে এসে বিষপানের হুমকি দিতেন। তাঁদের বিরুদ্ধে থানায় পাঁচটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। গত বুধবার পুলিশের ওপর থানার ভেতরেই হামলা করেছেন তাঁরা। অন্তত পাঁচজন পুলিশের সঙ্গে তাঁরা মারামারিতে জড়িয়েছেন। তিনজন নারী কনস্টেবল আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।’

এসআই পল্লব কুমার ঘোষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মারধর ও ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব অভিযোগ অবান্তর ও বানোয়াট।’

রেহেনা মোস্তফা ও তাঁর মেয়ের আইনজীবী মিজবাহ উদ্দিন বলেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভুক্তভোগীদের আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দেওয়া সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে খালাস দিয়েছেন। সন্ধ্যায় তাঁরা জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।

মিজবাহ উদ্দিন বলেন, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী জুবাইদা ও তাঁর মা রেহেনা পুলিশের ওপর হামলা করেছে, শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। থানার ভেতর ঢুকে শারীরিকভাবে আঘাত করার ঘটনায় ফৌজদারি আইনে মামলা করে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে পারত। কিন্তু সেটা না করে পুলিশের ওপর হামলা দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক।

Read full story at source