এক পায়ে দাঁড়িয়ে ফজলারের আত্মমর্যাদার লড়াই

· Prothom Alo

ভোরের আলো ফোটার আগেই উত্তর জানপুরের কাঁচা পথে বেরিয়ে পড়েন ফজলার রহমান। এক পায়ে ভর দিয়েই শুরু হয় তাঁর দিনের সংগ্রাম। বাজারে যাওয়ার তাড়া নয় শুধু, তাঁকে টানে দায়িত্ব, টানে আত্মমর্যাদা। সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারান ফজলার। সে পায়ের অভাবকে শক্তি বানিয়ে আজ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন জীবনের হাল ধরে। ভিক্ষার হাত বাড়াননি, কখনো ঘাম ঝরিয়ে, কষ্ট চেপে ধরে প্রতিদিন নতুন করে প্রমাণ করছেন—মানুষ হার মানে না, মানুষ লড়ে।

Visit amunra.help for more information.

রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত উত্তর জানপুর জনাবের ডাংগা গ্রামে দেখা মেলে এই নীরব সংগ্রামের মানুষটির। তিন বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পা হারান ফজলার রহমান। দুর্ঘটনার পর জীবন যেন থমকে গিয়েছিল একসময়। চিকিৎসা, সংসারের চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি। কিন্তু ভেঙে পড়েননি তিনি। পঙ্গুত্বকে অভিশাপ না ভেবে তাকে সঙ্গী করেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ফজলার রহমানের সংসারে আছেন স্ত্রী খাদিজা বেগম, তিন কন্যা ও এক বিধবা মা। ছয়জন মানুষ তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট টিনঘেরা বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে বিক্রির জন্য কাঁচা ভুঁড়ি নিজ হাতে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করছেন তিনি। এক পায়ে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করা যে কতটা কষ্টের, তা তাঁর ঘামেই বোঝা যায়।

কথা হলে ফজলার রহমান শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি পঙ্গু। সংসারের হাল ধরার কেউ নেই। একসময় মনে হতো ভিক্ষা করে খেতে হবে। কিন্তু তাতে আমার মন সায় দেয় না। ভ্যানে করে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাজারে যাই। ভ্যানচালক সাহায্য করে। যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চলে।’ সরকারি কোনো সহায়তা বা প্রতিবন্ধী ভাতা পান কি না—এ প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন তিনি। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কোনো ভাতা পাই না। অনেক জায়গায় গেছি, কিন্তু হয়নি। নিজের পরিশ্রমেই চলছি।’

ফজলার রহমান জানান, মমিনপুর হাট, মুন্সির হাট, সেন্টারের হাটে তিনি নিয়মিত বসেন। প্রতি কেজি গরুর ভুঁড়ি বিক্রি করেন ৩০০ টাকা দরে। দৈনিক বিক্রি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার হাজার টাকা। খরচ বাদে প্রতিদিন আয় হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
পাশে বসা স্ত্রী খাদিজা বেগমের চোখ ভিজে ওঠে। তিনি বলেন, ‘এক্সিডেন্টের দিনটা এখনো চোখের সামনে ভাসে। ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। তখন মনে হয়েছিল সব শেষ। কিন্তু উনি হাল ছাড়েননি। এই আয় দিয়েই তিন মেয়েকে বড় করছি, শাশুড়িকে দেখছি। মেয়েগুলোর ভবিষ্যৎ ভাবলেই বুক কেঁপে ওঠে।’

ফজলারের বৃদ্ধ মা মাফজিলা বেওয়া আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘মোর ছাওয়া এক্সিডেন্ট করছেই। একান পাও কাটি ফেলাইছে। তাও দিন আনি দিন খাই। আল্লাহে যেন আর কষ্ট না দেয়।’

প্রতিবেশীরা জানান, ফজলার রহমান প্রতিদিন ভোরে উঠে মেয়েকে ও ভ্যানচালককে সঙ্গে নিয়ে আড়তে যান। সেখান থেকে কাঁচা ভুঁড়ি সংগ্রহ করে বাড়িতে এনে পরিষ্কার করেন। এরপর ছয় থেকে দশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাজারে গিয়ে নিজ হাতে মাল নামান, মেপে মেপে বিক্রি করেন। এক পায়ে ভর দিয়ে এই পুরো প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া সহজ নয়, তবু কোনো অভিযোগ নেই তাঁর মুখে।

রংপুর সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা শিকা রানী রায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ফজলার রহমান আবেদন করলেই প্রতিবন্ধীর তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর তাঁর ভাতার ব্যবস্থাও করে দেওয়া হবে।

মমিনপুর বাজারে কথা হয় বাদল মিয়া নামে একজন ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এনাকে দেখলে কষ্ট লাগে। খুঁড়িয়ে হাঁটে, কিন্তু কাউকে বিরক্ত করে না। মাল ভালো দেয়, দামও ন্যায্য নেয়। কখনো ঠকায় না।’ আরেক ক্রেতা খায়রুল মন্ডল যোগ করেন, ‘ভিক্ষা না করে ব্যবসা করে খাওয়ার এই মানসিকতাই তো মানুষকে বড় করে। ফজলার ভাই আমাদের জন্য উদাহরণ।’

Read full story at source