ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: আস্থা ও বাস্তবতার দূরত্ব এবং সংস্কারের অপরিহার্যতা

· Prothom Alo

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) সেবা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে হয়, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মেধা ও ত্যাগে এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে বলতে হয়, মন্ত্রীর আস্থার প্রতিফলন রোগী পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গরূপে পেতে হলে কিছু কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা জরুরি।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

জরুরি বিভাগের অভিজ্ঞতা ও তথ্যের স্বচ্ছতা—

সম্প্রতি এক আত্মীয়কে রাত ৯টার পর জরুরি বিভাগে ভর্তি করার পর তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। রাত ১১টার দিকে কিছু পরীক্ষা দেওয়া হলে জনৈক ব্যক্তি নিজেকে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, এই পরীক্ষাগুলো এখন হাসপাতালে সম্ভব নয়। অথচ পরবর্তী সময়ে প্যাথলজি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি নিয়মেই অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে পরীক্ষাগুলো সেখানে করা সম্ভব।

এ ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে—হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রোগীরা কেন বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন? কেন হাসপাতালের ভেতরেই দালালেরা তথ্য গোপনের সুযোগ পাচ্ছেন?

নাগরিক সংবাদ-এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দালাল চক্র ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা—

সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে দালাল চক্রবিরোধী অভিযানের খবর আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বেলা ২টার পর বহির্বিভাগ বন্ধ হয়ে গেলে হাসপাতালে তথ্যের একধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগই নেয় দালাল চক্র। এ ছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারীর অপেশাদার আচরণ, বেড ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ওষুধের প্রাপ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ রয়েছে। জন–আস্থা ধরে রাখতে হলে এই অনানুষ্ঠানিক প্রভাববলয় ভেঙে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়।

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বনাম বিপুল চাপ—

এটি সত্য যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ধারণক্ষমতার চেয়ে রোগীর চাপ বহুগুণ বেশি। এই বিশাল চাপ সামলাতে গিয়ে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়, যার ফলে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নেওয়া বা দীর্ঘ অপেক্ষার মতো সমস্যাগুলো তৈরি হয়। এটি কেবল একটি হাসপাতালের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। তবে স্বচ্ছতা ও সদিচ্ছা থাকলে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব।

টেকসই সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা—

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সুদৃঢ় অবস্থানকে বাস্তবে রূপ দিতে নিচের পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:

আকস্মিক পরিদর্শন: বিশেষ করে সন্ধ্যা ও গভীর রাতে জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ডগুলোতে আকস্মিক তদারকি বৃদ্ধি করা।

তথ্যকেন্দ্র ও ডিজিটাল ডিসপ্লে: কোন কোন পরীক্ষা হাসপাতালে হচ্ছে এবং তার সরকারি ফি কত, তা প্রতিটি ওয়ার্ড ও প্রবেশপথে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে দৃশ্যমান করা।

দালালমুক্ত ক্যাম্পাস: হাসপাতাল এলাকায় অননুমোদিত বহিরাগত ও রেফারেল দালালচক্র প্রতিরোধে স্থায়ী নিরাপত্তা ও মনিটরিং সেল গঠন।

অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা: রোগীদের অভিযোগ সরাসরি জানানোর জন্য একটি কার্যকরণ হটলাইন বা ডিজিটাল বুথ স্থাপন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের প্রতীক। আমাদের উদ্দেশ্য সমালোচনা নয়, বরং গঠনমূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা সমুন্নত রাখা। স্বচ্ছতা, মানবিক আচরণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত হলে মন্ত্রীর আস্থার সঙ্গে বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটবে—এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক: মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী শিক্ষক, কোন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা

Read full story at source