দরবার চত্বরের দীর্ঘশ্বাস
· Prothom Alo

ভূমিকম্পের ক্ষত বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কাঠমান্ডুর দরবার স্কয়ার ইতিহাস, স্থাপত্য আর স্মৃতির মেলবন্ধন— যেখানে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও মানুষ খোঁজে সৌন্দর্য, প্রেম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার অদম্য শক্তি।
২৫ এপ্রিল ২০১৫ সাল। বেলা ১১টা বেজে ৫৬ মিনিট। সূর্য কেবল মধ্যগগনে পৌঁছেছে। অন্য দিনের মতোই লোকজন কাজে বের হয়েছেন। কাঠমান্ডু শহরের বিখ্যাত দরবার চত্বরে শুরু হয়েছে পর্যটকদের আনাগোনা। রাস্তার পাশে বাহারি জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। শান্ত, সৌম্য পরিবেশ। হঠাৎ করেই চারপাশ দুলতে শুরু করল। কেঁপে উঠল ভূমি। আকস্মিক এই কম্পনে ভেঙে পড়ল শতাব্দীপ্রাচীন দরবার চত্বরের অলংকৃত ভবনগুলো। চার দেশে বিস্তৃত সাত দশমিক আট মাত্রার এই ভূমিকম্প কেড়ে নিয়েছিল আট হাজারের বেশি তাজা প্রাণ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল কাঠমান্ডুসহ নেপালের আরও বেশ কিছু শহরকে। দরবার চত্বরের ভেতরে প্রবেশ করে অনুভব করলাম, পাঁচ বছরেও সেই ক্ষত এখনো সারাতে পারেনি নেপাল।
Visit truewildgame.online for more information.
আগের দিন বিকেলে পৌঁছেছি কাঠমান্ডুতে। হোটেল ছাড়ার সময় মনোজদা ও কল্পনাদি খুব করে বলেছেন যেন আবারও ঘুরতে আসি। আমরাও কথা দিয়েছি যে অবশ্যই ফিরে আসব পোখারায়। অল্প সময়েই খুব হৃদ্যতা হয়েছে এই দম্পতির সঙ্গে। ওঁদের আতিথেয়তা মনে থাকবে। গতকাল আকাশ ছিল ভীষণ পরিষ্কার।
হাজারো কবুতর ঘিরে ধরেছে দর্শনার্থীদেরনীল আকাশের পটভূমিতে ধবল মাছুপুছারে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছিল। ঠিক যেন নীল ক্যানভাসে শুভ্র তুলির স্পষ্ট আঁচড়। পোখারা বিমানবন্দর থেকেই অন্নপূর্ণার দেখা পাওয়া যাচ্ছিল ভালোভাবেই। তবে সত্যিকারের চমক ছিল বিমানের ভেতর। যাত্রা শুরুর পর থেকেই সব কটি চূড়া এতটাই স্পষ্ট এবং কাছে দেখা যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল প্লেনের জানালা খুলে হাত বাড়ালেই স্পর্শ করা যাবে। আমৃত্যু স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মতো এক বিমান ভ্রমণ ছিল সেটি।
কাঠমান্ডুতে ক্ল্যাসিক নেপাল নামের যেই হোটেলে উঠেছি, সেটি মোটেও আহামরি গোছের নয়। অনলাইনে হোটেল বুকিং দিয়ে বেশ ভালোই শিক্ষা পেয়েছি। ছবিতে যেই কক্ষ দেখিয়ে বুকিং নেয়, ওঠার সময় সেই কক্ষ দিতে চায় না। আগে থেকে যেহেতু দেখার উপায় থাকে না, তাই কিছু বলাও যায় না। তর্ক করেও খুব একটা লাভ হয় না। এক রাতের ব্যাপার যেহেতু মুখ বুঝে সহ্য করা ছাড়া গতি নেই। অবশ্য সন্ধ্যার পর থামেলের অলিগলিতে ঘোরাঘুরি করে সময়টা মন্দ কাটেনি। এইখানটায় ঘুরলে মনে হয় যে শহরটা জেগে আছে। এমনিতে শহরের অন্যান্য অংশ বেশ আগেই ঘুমায়। দু–একবার রাস্তা হারিয়ে ফেললেও গুগল মানচিত্রের কল্যাণে হোটেলে ফিরে আসতে সমস্যা হয়নি।
আজ দুপুরের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরে যাব। সকালটা কাজে লাগানোর জন্য দরবার স্কয়ারে ঘুরতে আসা। নেপালেও যে রিকশা চলে জানা ছিল না। রোদ থেকে বাঁচার জন্য রিকশাওয়ালা যেখানে বসেন তার একটু সামনে শক্ত স্ট্যান্ডের ওপর একটি ছাতা আটকানো আছে। এই পদ্ধতিটা ঢাকার রিকশাগুলোতে কাজে লাগালে মন্দ হয় না। গরমের সময় রিকশাচালকদের যেই কষ্টটা হয় সেটি অবর্ণনীয়।
নেপালেও রিকশা চলে; তাই স্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তুলে রাখছেন লেখকনেপালে তিনটি দরবার স্কয়ার আছে। কাঠমান্ডু, পতন ও ভক্তপুর। ট্যাক্সিতে করে এক ঘণ্টা সময়েই সব কটি ঘুরে আসা যায়। সব কটিই বানানো হয়েছে ১৪০০ থেকে ১৭০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে। আদতে এগুলোকে রাজপ্রাসাদ বলাই ভালো। এপাশটায় তখন বিভিন্ন রাজাদের শাসন চলত। তিন রাজার তিন প্রাসাদ। শাসনকার্যের সুবিধার জন্যই চত্বরে গড়ে উঠেছিল একাধিক মন্দির, শাসনকার্যে ব্যবহৃত ভবন, রাজার নিবাস, কুমারী দেবীর আবাসস্থল, দেবদেবীর ভাস্কর্য।
সাতসকালেই দরবার স্কয়ারে মানুষের ভিড় জমেছে। প্রবেশমুখে প্রথমেই দেখা হলো কালা ভৈরবের সঙ্গে। দুই মানুষ উঁচু শিবের এই ভয়ংকর মূর্তির সামনে নৈবেদ্য সাজিয়ে ভক্তকুল হাজির। কথিত আছে, কেউ যদি ভৈরবের মূর্তির সামনে মিথ্যা বলে তাহলে তৎক্ষণাৎ তাঁর মৃত্যু ঘটবে। শোনামাত্রই বউ কোমরে হাত দিয়ে বলে উঠল, ‘সত্যি করে বলো, আমি ছাড়া অন্য কেউ আছে নাকি জীবনে? চলছে নাকি কারও সঙ্গে গোপন প্রণয়? বুঝেশুনে উত্তর দাও। মিথ্যা বললেই কিন্তু শেষ হয়ে যাবে?’
‘একটাকেই সামলাতে জীবন তামা হয়ে যাচ্ছে, একাধিক কীভাবে সামলাব বলে দাও প্রিয়ে।’
খিলখিল হাসির সঙ্গে আমার কথাটা উড়িয়ে দিয়ে ম্যাডাম প্রবেশ করলেন দরবার চত্বরে। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের ঘিরে ধরল হাজারো কবুতর। সিলেটের জালালি কবুতরের জাতভাই মনে হচ্ছে দেখে। এক ইউরোপিয়ান দম্পতিকে চারপাশটা ঘুরে দেখাচ্ছিলেন স্থানীয় এক প্রদর্শক।
কালা ভৈরবের মূর্তির সামনে পূজারিদের ভিড়তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী দুনিয়াতে যারা খারাপ কাজ করে, মৃত্যুর পর নাকি তারা এইখানে কবুতর হিসেবে ফেরত আসে। সেই হিসেবে দুনিয়াতে আসলে খারাপ মানুষের অভাব নেই। আবার এই কবুতরগুলোকে খাওয়ানোর মাধ্যমে নাকি 'গুড কার্মা’ সংগ্রহ করা যায়। সেই খাবার আবার এখানেই বিক্রি হচ্ছে। লোকাল অর্থনীতিকে চাঙা করার এই ব্যাপারটা কিন্তু মন্দ নয়।
কুমারী দেবীর মন্দির তথা বাসভবনটাও দেখা হলো বাইরে থেকে। এই দেবী আবার একদম জীবন্ত দেবী। এক শিশুকন্যাকে বিভিন্ন ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয় কুমারী দেবী হিসেবে। রজঃচক্র শুরু হওয়া পর্যন্ত সে দেবী হিসেবে পূজিত হয় এবং এই ভবনটিতেই বাস করে। আমাদের অবশ্য দেবী দর্শন হয়নি। তবে অনেকগুলো মন্দির দর্শন হয়েছে বাইরে থেকে। সব কটির ভেতরে এমনিতেও সবার প্রবেশাধিকার নেই। মন্দির ও ভবনগুলো স্থাপত্যকলার এক একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন।
কুমারী দেবীর নিবাস। দেয়ালে কাঠ দিয়ে ঠেক দেওয়া আছে যেন ধ্বসে না যায়মন্দিরগাত্রে হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন চরিত্র এবং ঘটনা বিধৃত আছে চমৎকারভাবে। সব কটি মন্দিরের মাঝে শিব-পার্বতী মন্দিরের দেয়ালের কাজগুলো আমার বেশি ভালো লেগেছে। মন্দিরের দোতলার জানালায় পার্বতী এবং শিবের ছোট্ট একটা জোড়া মূর্তি সাজানো আছে। হুট করে দেখলে মনে হয় ওনারা তাকিয়ে আছেন দর্শনার্থীদের পানে। বিষ্ণুর অবতার গরুড় (পাখিসদৃশ মানুষ), গণেশের বাহন ইঁদুর কিংবা হনুমানের মূর্তিও শোভাবর্ধন করছে চত্বরের।
ভবনগুলোর বেশির ভাগই ধসে পড়েছিল ভূমিকম্পের ধাক্কায়। বর্তমানে সংরক্ষণের কাজ চলছে। কাঠ ও লোহার দণ্ড দিয়ে ঠেক দিয়ে রাখা আছে, যেন দেয়ালগুলো আবারও ধসে না যায়। এসব দেয়ালের মাঝে ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত একটা ভবন দেখে অবাক হতে হয়। সাদা রঙের ভবনটি চমৎকার, যদিও লাল-কালো ইট কিংবা পাথর নির্মিত বাকি ভবনগুলো থেকে সেটি একদমই আলাদা।
চমৎকার কারুকার্যমন্ডিত শিব পার্বতীর মন্দিরের সামনে লেখকভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯০৮ সালে, নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ইউরোপ সফরের পর। চারতলার হনুমান ধোকার ভবনটিও সাদা রং করা। পুরো চত্বরের সৌন্দর্য কেমন জানি ফিকে হয়ে গেছে সাদা বর্ণের এই দুই ভবনের জন্য। দুই দফা ভূমিকম্প (১৯৩৪ ও ২০১৫) আর সংস্কারের ধাক্কায় পুরো দরবার চত্বর যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। ভালো করে কান পাতলেই সেটি বোঝা যায়।
পুরো চত্বরজুড়েই ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ভ্রাম্যমাণ দোকান। হাতে বানানো গয়না, হিন্দু কিংবা বৌদ্ধ দেবদেবী আর স্মারকের সংখ্যাই বেশি। স্থায়ী দোকানগুলোতে অবশ্য কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো মন্ত্রপূত কাপড়, সুদৃশ্য থাংকা, হাতে বানানো পুতুল এবং ড্রিম ক্যাচারের আধিক্য চোখে পড়ে। এই ড্রিম ক্যাচার নামক বস্তুটি আমাদের বেশ মনে ধরেছে। রঙিন কাপড় আর সুতা দিয়ে তৈরি গোলাকৃতি বস্তুটি দরজা কিংবা জানালায় ঝোলানো যায়।
ভ্রাম্যমাণ দোকানপাটবলা হয়ে থাকে মানুষ ঘুমিয়ে যেই স্বপ্নগুলো দেখে, সেগুলো ড্রিম ক্যাচার আটকাতে পারে। তাই জেগে ওঠার পরও সুন্দর স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায় না। ড্রিম ক্যাচারের আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ নেই। আমি একটা নাম ঠিক করেছি যদিও, স্বপ্নাধার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যারা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে কিংবা যেসব স্বপ্ন আমরা ভুলে যেতে চাই, এই স্বপ্নাধার কি সেগুলোকেও আটকাবে?
মৌ একটা মাঝারি আকৃতির স্বপ্নাধার কিনে ব্যাগে ভরে নিল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বলল, ‘তোমাকে নিয়ে সারা জীবন একসঙ্গে কাটানোর যেই স্বপ্ন আমি দেখি, সেটাকে না হয় এর ভেতরেই বন্দী করে রাখলাম।’
ছবি: লেখক