সেন্ট মার্টিনে এমন জানাজা আগে দেখিনি কেউ
· Prothom Alo

সমুদ্রপাড়ে এক অভূতপূর্ব জানাজার সাক্ষী হলেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপবাসী। সেন্ট মার্টিনে আকাশ ও সমুদ্রে নীলের মিতালি বরাবরই অন্য রকম। সেদিনের নীল যেন শোক আর বেদনা ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। এক পাশে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, বেলাভূমিতে জানাজায় দাঁড়ানো সারিবদ্ধ মানুষ। আরেক পাশে একটু দূরে দাঁড়িয়েছেন গ্রামের নারীরা। তাঁরাও ঘরবাড়ি থেকে ছুটে এসেছেন। বিদায় জানাতে এসেছেন দ্বীপের প্রিয় সন্তানকে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
পশ্চিম পাড়ার মরহুম আলী হোসেনের কনিষ্ঠ পুত্র আবদুল মালেক। পরিচয়টা এইটুকুতেই শেষ হতে পারত। কিন্তু অমায়িক, শান্তশিষ্ট, সদাহাস্যোজ্বল ও পরোপকারী ছেলেটা তাঁর পরিচয়ের পরিধি বাড়িয়ে নিজেই নিজের পরিচয় হয়ে ওঠেন। দ্বীপের মানুষের অধিকার আদায়ে সম্মুখ সারিতে থাকার কারণে স্থানীয় তরুণদের আইডল বনে যান।
কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মৃত্যুর মিছিলে শামিল হলেন আবদুল মালেকও। ২৫ ফেব্রুয়ারি সিএনজিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে হারাতে হলো দ্বীপের সবার প্রিয়পাত্র এই তরুণকে। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রিয়মুখ ছিলেন মালেক। সাংবাদিকতা, কনটেন্ট নির্মাণের কারণে কে না চিনত তাঁকে! পাশাপাশি শুরু করেছিলেন পর্যটন ব্যবসাও।
বুধবার দুপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দ্বীপে এলে কেউ বিশ্বাস করতেই চাননি তাঁদের প্রিয় মালেক আর নেই। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূত্র মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত করার পর পুরো দ্বীপে শোকের ছায়া নেমে আসে। শুধু তাঁর পরিবার-পরিজন বা বন্ধুবান্ধব নন, পুরো সেন্ট মার্টিন কান্নায় ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের স্ক্রিন ছেয়ে যায় তাঁর মৃত্যুর খবরে। মানুষ তাঁদের প্রিয় মালেকের সঙ্গে তোলা ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে স্মৃতিচারণা করেন।
পরদিন মালেকের মরদেহ দ্বীপে আনার খবর পেয়ে সকাল থেকেই জেটিতে সহস্র মানুষ অপেক্ষা করেন। আবালবৃদ্ধবনিতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও চাকরি প্রায় সর্বস্তরের মানুষ জেটিতে ভিড় জমিয়েছিল তাঁকে একনজর দেখার জন্য। সেন্ট মার্টিনের এত মানুষ এর আগে কখন একসঙ্গে এভাবে জেটিতে ভিড় করেছিলেন, মনে পড়ে না।
দুপুরে যখন উত্তর সৈকতে জানাজা হয়, তখন দেখা যায় লোকে লোকারণ্য। শেষবিদায় জানাতে ও জানাজায় শরিক হতে দ্বীপের মানুষের পাশাপাশি দ্বীপের বাইরে থেকেও পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসেছিলেন। গ্রামের মা-বোনেরাও জানাজা দেখতে দ্বীপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন।
জীবিত মালেকের চেয়ে মৃত মালেক হয়ে উঠেছিলেন দ্বীপের কিংবদন্তি! লাশ দেখতে আসা বা জানাজায় আসা প্রায় সব মানুষের চোখে জল আটকানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল সেদিন।
সেন্ট মার্টিনের ইতিহাসে এযাবৎকালে সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছিল মালেকের। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আবদুল মালেকের এমন ‘অর্জন’ মানুষের মুখে মুখে। মালেক নিজের ফেসবুকের বায়োতে লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুর পর আমার লাশটি জন্মভূমি সেন্ট মার্টিনে বাবা–মায়ের কবরের পাশে শায়িত করিও।’ কে জানত, তাঁর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবে এভাবে।
তৈয়ব উল্লাহ সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা ও অধিকারকর্মী