ঈদের আগে হাতে তৈরি জুতার কারখানায় অন্য রকম ব্যস্ততা
· Prothom Alo

গ্রামে ঢুকতেই কানে এল ঠুকঠাক শব্দ। কেউ রাবার কাটছেন, কেউ সোলের ওপর আঠা লাগাচ্ছেন। কেউ স্যান্ডেলে কোম্পানির নামের ছাপ বসাচ্ছেন, কেউ–বা চামড়ার ওপর সূক্ষ্ম নকশা তুলছেন। সামনে ঈদ। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রাম যেন এখন ব্যস্ত এক কর্মশালা।
বড়াল নদঘেঁষা কালুহাটি গ্রামটি স্থানীয়ভাবে ‘পাদুকাপল্লি’ নামে পরিচিত। মূলত হাতে তৈরি চামড়ার জুতার জন্যই গ্রামটি সুপরিচিত। ঈদ সামনে রেখে গ্রামের একাধিক কারখানায় দিনরাত কাজ চলছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিকেরা বলছেন, মেশিনে তৈরি জুতার পাশাপাশি হাতে তৈরি চামড়ার স্যান্ডেলের চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় এই শিল্প ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
গ্রামের ভেতরে ঢুকতেই চোখ গেল বাড়ির সামনে ঝোলানো সাইনবোর্ডে। নানা ধরনের দিক-চিহ্ন দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। ছোট ছোট টিনশেড বা আধাপাকা ঘরেই গড়ে উঠেছে কারখানা। একেকটি ঘরে ১০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত শ্রমিক কাজ করছেন। একই কক্ষে বসে কেউ চামড়া কাটছেন, কেউ সেলাই করছেন, কেউ ফরমা দিয়ে ফিটিং ঠিক করছেন। শেষে রং ও ফিনিশিংয়ের কাজ।
কারখানা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি স্যান্ডেল এক হাতে তৈরি হয় না। আপার, সোল, ফিটিং ও ফিনিশিং—এভাবে দুই থেকে তিনজনের হাত ঘুরে তবেই চূড়ান্ত রূপ পায় একটি জুতা।
কালুহাটিতে একসময় বছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ব্যবসা হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। করোনার আগপর্যন্ত ৭৫টির মতো কারখানা ছিল। এখন টিকে আছে অর্ধেকের কম। করোনার ধাক্কা, বিদেশি পণ্যের আধিপত্য ও ক্রেতাসংকটে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। অনেক কারখানা আবার চালু হয়েছে।
একটি কারখানার শ্রমিক মোহাম্মদ সম্রাট আলী প্রায় ২০ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। এখন জুতা তৈরির প্রায় সব ধাপেই তিনি দক্ষ। জুতার ডজনভিত্তিক মজুরি পান তিনি। সম্রাট বলেন, ‘কাজ করলে আয় আছে, না করলে নাই। সারা বছরই কাজ থাকে। তবে ঈদের আগে অর্ডার বেশি থাকায় আয় ভালো হয়। আগের চেয়ে হাতে তৈরি জুতার চাহিদা বেড়েছে।’
শ্রমিকেরা বলছেন, চার ধাপে কাজ ভাগ করা থাকে। ধাপ ভেদে মজুরি নির্ধারিত হয়। কেউ সোল তৈরি করেন, কেউ আপার, কেউ–বা ফিনিশিং। অনেকেই ২০ থেকে ৩০ বছর ধরে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার কালুহাটি গ্রামে হাতে তৈরি জুতার কারখানায় দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা জুতা কিনতে আসছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরেস্থানীয় তরুণ মো. রনি ৯ বছর ধরে কাজ করছেন। তিনি বলেন, সারা বছরই তাঁর কাজ থাকে। ঈদের আগে রাত-দিন মিলিয়ে কাজ করতে হয়। গ্রামের সব কারখানা চালু হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
কাঁচামালের একটি অংশ ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসে। দক্ষ কারিগরেরা তা প্রক্রিয়াজাত করে হাতে স্যান্ডেল তৈরি করেন। উদ্যোক্তারা জানান, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা এসে মাল নিয়ে যান। রাজশাহী ছাড়াও যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, রংপুর ও পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ডার আসে।
‘রাজ সুজ’-এর উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রাজিব আলী বলেন, ‘আগে পরিস্থিতি খারাপ ছিল। এখন আল্লাহর রহমতে ভালো। ঈদের আগে তো সারারাত কাজ চলে, এক-দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে।’ হাতে তৈরি জুতার চাহিদা বেড়েছে জানিয়ে বলেন, ‘মানুষজন দেশের বাইরে থেকে আসা জুতা পরা ধীরে ধীরে বাদ দিচ্ছে। চিকিৎসকেরাও পরামর্শ দেন যে চামড়ার জুতা পরতে হবে। এটা স্বাস্থ্যসম্মত। সব মিলিয়ে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ ভালো দেখছি।’
‘বিজয় সুজ’-এর ব্যবস্থাপনায় থাকা রাফিউল ইসলামকে খুব ব্যস্ত সময় কাটাতে হচ্ছে। অনেক ক্রেতা তাঁর কারখানায় ভিড় করছেন। ব্যস্ততার মধ্যে বললেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের বয়স ১০ বছরের বেশি। মোটামুটিভাবে উত্তরবঙ্গে সব জেলায় তাঁদের শোরুম আছে। প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। সবাই স্থানীয়। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে কিছুটা অস্থিরতা ছিল। এখন পরিস্থিতি স্থিতিশীল। ঈদ উপলক্ষে বড় ধরনের অর্ডার পেয়েছেন। তিনি সরকারের কাছে প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানো ও রপ্তানির সুযোগ তৈরির দাবি জানান।
গতকাল বৃহস্পতিবার দিনভর গ্রামে ঘুরে একাধিক কারখানায় গিয়ে দেখা গেছে, সারা বছর বন্ধ থাকলেও ঈদ সামনে রেখে অনেকে কারখানা চালু করেছেন। অনেকে নানা জায়গা থেকে জুতার অর্ডারও পাচ্ছেন।
‘শ্রাবণী সুজ’ কারখানার মালিক ইসরাইল প্রামাণিক বলেন, তাঁরা ঈদ সামনে রেখেই কাজ করেন। সারা বছর ক্রেতা কম। আগের মতো ব্যবসা নেই। তবে এবার অর্ডার আসা শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে, সামনে ব্যবসা হবে।
‘পায়ে পায়ে সুজ’ কারখানার মালিক জয়নাল আবেদীন জুতার কারখানার একটি অংশ ভেঙে এক বছর আগে মুদিদোকান করেছিলেন। এখন সেই মুদিদোকান নেই। সেখানে তিনি জুতা বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন। নাটোরের নলডাঙ্গা বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ তাহমিদকে দোকানে পাওয়া গেল। তিনি ঈদের আগে জুতা কিনতে গ্রামে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ছয়-সাত বছর ধরে এখান থেকে মাল নিচ্ছি। মান ভালো, দামও তুলনামূলক সাশ্রয়ী। জেন্টস, লেডিস, বাচ্চাদের সব ধরনের স্যান্ডেল পাওয়া যায়। এই জুতা ক্রেতারাও পছন্দ করে।’
উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে প্রতি জোড়া স্যান্ডেল পাইকারিতে ৩০০ থেকে হাজারের বেশি টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। মডেল ভেদে দামও ভিন্ন। চামড়ার স্যান্ডেল স্বাস্থ্যসম্মত ও টেকসই হওয়ায় ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।