করোনার পর থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ হারিয়েছি, কী করব?

· Prothom Alo

পাঠকের কাছ থেকে মনোজগৎ, ব্যক্তিজীবন ও সন্তান পালনের মতো সমস্যা নিয়ে ‘পাঠকের প্রশ্ন’ বিভাগে নানা রকমের প্রশ্ন এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার নির্বাচিত একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এবার।

প্রশ্ন

আমি একজন মেয়ে, বয়স ১৪। ছোটবেলায় আমি খুব ভালো ছাত্রী ছিলাম, কিন্তু করোনায় লকডাউনের পর থেকে আমার লেখাপড়ার অবনতি হতে থাকে। লেখাপড়ায় খুব অমনোযোগী হয়ে গেছি। আগের মতো আর রেজাল্টও ভালো হচ্ছে না। এখন লেখাপড়াটা খুব চাপ মনে হয়, মা-বাবাকে সমস্যা খুলে বলতে পারছি না। লেখাপড়া ছাড়া বাকি সব কাজে আমার মনোযোগ খুব ভালো। এখন আমি কী করতে পারি?

Visit chickenroad.qpon for more information.

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

উত্তর

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার

তোমার মনের কথাগুলো আমাদের কাছে গুছিয়ে বলার জন্য অনেক ধন্যবাদ। বুঝতে পারছি, পরীক্ষার ফল আশাব্যঞ্জক হচ্ছে না বলে তুমি কষ্ট পাচ্ছ। পরীক্ষার ফলাফলের ব্যাপারে তোমার প্রত্যাশার জায়গাটা ঠিক কেমন, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারলে সুবিধা হতো।

যেমন, কারও প্রত্যাশা থাকে সব সময় প্রথম স্থান অধিকার করা, আবার কেউ মাঝারি ধরনের ফলাফলেই সন্তুষ্ট থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চ মাত্রার প্রত্যাশা বা নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা আমাদের ভেতরে একধরনের বাড়তি দুশ্চিন্তা এবং অস্থিরতা তৈরি করে, যা আমাদের মনোযোগকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তাই কোনো কিছু অর্জন করতে চাইলে প্রত্যাশার জায়গাটা বাস্তবসম্মত ও সাধ্যের মধ্যে রাখলে পদক্ষেপ নিতে সুবিধা হয়।

তুমি পড়ালেখায় অগ্রগতি চাইছ, এমনকি সহযোগিতা চেয়ে আমাদের কাছে লিখেছ—এই বিষয়গুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। তোমার এই পথচলা যেন অর্থপূর্ণ হয় সে জন্য প্রথমেই বলব—নিজের প্রতি সদয় থেকো, নিজেকে যত্নে রাখা সবচেয়ে জরুরি।

প্রায়ই দেখা যায়, কাছের মানুষ বা প্রিয় বন্ধুর কোনো সমস্যায় তার প্রতি আমরা যতটা ধৈর্য ও মমতা দেখাই, নিজের বেলায় তেমনটা হয় না। বরং প্রত্যাশা পূরণ না হলে খুব দ্রুতই নিজের প্রতি আমরা সমালোচনামুখর হয়ে পড়ি, ‘আমাকে দিয়ে কিছু হবে না’ বলে রায় দিয়ে ফেলি।

ধরো, তুমি একটি গোলাপগাছ বড় করছ। তুমি খেয়াল করছ, প্রত্যাশা অনুযায়ী গাছটি বাড়ছে না, ফুলও ফুটছে না, বরং দিন দিন মলিন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে তুমি কী করবে? আর যা–ই করো, সেটিকে বকাঝকা করে নিশ্চয়ই ফুল ফোটানো যাবে না! বরং কেন গাছটি মলিন হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধান করে সেই অনুযায়ী নিয়মিত যত্ন করতে হবে।

ঠিক তেমনি নিজে কোনো সমস্যায় পড়লে নিজেকে আগলে রাখার মানসিকতা নিয়ে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করতে হয় এবং প্রয়োজনে অন্যের সহযোগিতা নিতে হয় (যেমন তুমি আমাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছ)। এবারে চলো তোমার পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো খুঁজে বের করি—

  • করোনার সময়ের লকডাউনের প্রভাব: অনলাইন ক্লাস, রুটিন ভেঙে যাওয়া, অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম বা ইন্টারনেট আসক্তি।

  • বয়ঃসন্ধিকাল: এ সময়ে শিশু–কিশোরদের শরীর ও মস্তিষ্কে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। যা তাদের ভেতরে সহজেই মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অস্থিরতা, বিরক্তি, বিষণ্নতা ইত্যাদি তৈরি করতে পারে। ফলে দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগের অভাব ঘটে।পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও ব্যর্থতার আশঙ্কা তৈরি হয়।

  • অভিভাবক বা পরিবারের কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে না পারা: সমস্যায় পড়লে কাছের ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বললে আমাদের হালকা লাগে, মস্তিষ্ক কাজ করে বা সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তুত হয়। তুমি যেহেতু বলতে পারছ না, তাই ভেতরে একধরনের চাপ অনুভব করছ, ফলে কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হচ্ছে।

মনের যত্নে ২০টি বিষয় মেনে চলুন

মনোযোগ বাড়ানোর জন্য যা যা করতে পারো—

  • নিজেকে সাহস দাও: দোষারোপ বা বকাঝকা করার পরিবর্তে নিজেকে সাহস দাও। নিজেকে বলো, ‘এই সময়টা কঠিন, তবে সাময়িক। আমি একা নই। সব শিক্ষার্থীর জীবনেই কঠিন সময় আসে। আমি ধৈর্য ধরতে পারি। শান্ত থাকতে পারি। চেষ্টা করতে পারি। একটু একটু করে আমি আমার প্রত্যাশা পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারি।’

  • প্রত্যাশা মাত্রার মধ্যে রাখো: তুমি এখন যেমন ফলাফল করছ, সেখান থেকে যদি একলাফে অনেক বেশি ভালো বা নিখুঁত করতে চাও, তাহলে তোমার ভেতরে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। যা পড়ালেখায় মনোযোগে আরও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্রত্যাশাটাকে স্বাভাবিক মাত্রায় রেখে ধীরে ধীরে উন্নতি করার চেষ্টা করো।

  • বাস্তবসম্মত রুটিন করো: বিশ্রাম ও আনন্দের জন্য যথেষ্ট সময় রেখে দৈনন্দিন কাজ ও পড়ালেখার একটি রুটিন তৈরি করো। কোনো কারণে রুটিন ভেঙে গেলে দ্রুত রুটিনে ফেরার চেষ্টা করবে।

  • পর্যাপ্ত ঘুম ও সুষম খাবার: তোমার বয়স অনুযায়ী রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। সেই সঙ্গে খাবারে পর্যাপ্ত শাকসবজি ও আমিষ রাখা জরুরি, যা তোমাকে শক্তি জোগাবে।

  • কাছের ও বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলো: কোনো অসুবিধা বোধ করলে যদি মা-বাবার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রিয় কোনো নিকটাত্মীয় বা তোমার প্রিয় কোনো শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে পারো, যিনি তোমাকে সহযোগিতা করতে পারেন।

যদি প্রয়োজন মনে করো, তাহলে পেশাদার মনোবিজ্ঞানীর সহযোগিতা নিতে পারো। তোমার জন্য ভালোবাসা ও শুভকামনা।

লেখা পাঠানোর ঠিকানা

ই–মেইল ঠিকানা: [email protected]

(সাবজেক্ট হিসেবে লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)।

ডাক ঠিকানা: অধুনা, প্রথম আলো

১৯ কারওয়ান বাজার, ঢাকা-১২১৫। (খামের ওপর লিখুন ‘পাঠকের প্রশ্ন’)

ফেসবুক পেজ: fb.com/Adhuna.PA

অফিসে যে ৬টি বিষয়ে সচেতন হলে আপনার মন খারাপ হবে না

Read full story at source